ব্রিটেনে ক্ষমতার ডমিনো ইফেক্ট: ১০ বছরে কেন ৬ প্রধানমন্ত্রী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৩ জুন) : লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট—বিখ্যাত চকচকে কালো দরজার এই ঐতিহাসিক ভবনটি প্রায় ৩০০ বছর ধরে ব্রিটিশ রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। একসময় যেখানে উইনস্টন চার্চিল ৯ বছর, মার্গারেট থ্যাচার ১২ বছর কিংবা টনি ব্লেয়ার টানা এক দশক নির্বিঘ্নে শাসন চালিয়েছেন, সেখানে গত এক দশকে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসেছেন ছয়জন নেতা। পরিস্থিতি এতটাই অস্থির যে, অনেকের ক্ষেত্রে মালপত্র গোছানোর আগেই বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে।

বিগত মাত্র চার বছরেই দেশটিতে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে। ব্রিটিশ রাজনীতির এই নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতার নেপথ্যে মূলত কাজ করছে এক জটিল শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং ‘ব্রেক্সিট’ পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা।

ক্ষমতার পালাবদলের নেপথ্যে যে নিয়ম

যুক্তরাজ্যের সরকারপ্রধান নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি আমেরিকার মতো সরাসরি নয়। ব্রিটিশ ভোটাররা মূলত পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’-এর সদস্যদের (এমপি) নির্বাচিত করেন। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সেই দলের নেতাই সরকার গঠন করেন। তবে এই ব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে যেকোনো সময় অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে তাদের নেতা পরিবর্তন করতে পারে। ক্ষমতাসীন কোনো প্রধানমন্ত্রী যদি নিজের দলের ভেতরেই আস্থা হারান, তবে তাকে পদ ছাড়তে হয়। দল থেকে পদত্যাগ বা বহিষ্কারের সাথে সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় প্রধানমন্ত্রিত্ব। এই সাংবিধানিক সুযোগের কারণেই সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই বারবার প্রধানমন্ত্রী বদলের ঘটনা ঘটছে। আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন বাধ্যতামূলক হলেও, ক্ষমতাসীন দল চাইলে যেকোনো সময় আগাম নির্বাচন ডাকতে পারে, যা গত এক দশকে ব্রিটেনের রাজনীতিতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।

ব্রেক্সিট: মেরুকরণ ও প্রতিশ্রুতির ফাঁদ

যুক্তরাজ্যের এই রাজনৈতিক সংকটের মূল বীজ রোপিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ঐতিহাসিক ব্রেক্সিট (ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ) গণভোটের মাধ্যমে। তৎকালীন কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ-তে থাকার পক্ষে প্রচারণা চালালেও গণভোটে জনগণ বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দেয়। নৈতিক পরাজয় মেনে নিয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন ক্যামেরন। ব্রেক্সিট কেবল সরকারই পরিবর্তন করেনি, দেশটির প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটব্যাঙ্কেও বড় ধরনের ধস নামায়।

ব্রেক্সিটের সময় ভোটারদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হলে অভিবাসন কমবে, অর্থনীতির চাকা সচল হবে এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বড় তহবিল পাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জেরে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কর্পূরের মতো উড়ে যায়। উল্টো দেশজুড়ে শুরু হয় চরম অর্থনৈতিক স্থবিরতা।

মে থেকে সুনাক: কনজারভেটিভদের উত্থান-পতন

ক্যামেরনের পর ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের হাল ধরেছিলেন থেরেসা মে, কিন্তু দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত হয়ে ২০১৯ সালে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে বিদায় নিতে হয়। এরপর ‘গেট ব্রেক্সিট ডান’ স্লোগান দিয়ে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন বরিস জনসন। তবে তার মেয়াদকাল ছিল কেলেঙ্কারিতে ভরা। করোনাকালীন লকডাউনের নিয়ম ভেঙে ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি করা (পার্টিগেট কেলেঙ্কারি) এবং এক বিতর্কিত নেতাকে পদোন্নতি দেওয়ার জেরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিজ ট্রাস মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় থেকে ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার রেকর্ড গড়েন। তার বিতর্কিত ‘মিনি-বাজেট’ দেশের আর্থিক বাজারে বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। এরপর হাল ধরেন ঋষি সুনাক। প্রায় দুই বছর চেষ্টা করলেও মহামারি ও যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলায় তিনি ব্যর্থ হন। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সাধারণ নির্বাচনে দীর্ঘ ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি।

লেবার পার্টিতেও সংকটের হাওয়া: দোরগোড়ায় নতুন কেউ?

বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে লেবার পার্টির কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হলেও মাত্র দুই বছরের মাথায় তার সরকারও এখন খাদের কিনারায়। নীতিগত ইউ-টার্ন, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সঠিক দূরদর্শিতার অভাবে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর ওপর বিতর্কিত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টাইনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়ে বড় ধরনের কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন স্টারমার।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় পরাজয় স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন এবং তাকে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে মূলধারার রাজনীতিতে দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে ব্রেক্সিটের অন্যতম কারিগর নাইজেল ফারাজের পপুলিস্ট দল ‘রিফর্ম ইউকে’।

আইন অনুযায়ী ২০২৯ সালের আগস্টের আগে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা নয়। তবে স্টারমার যদি নিজের দলের ভেতরের বিদ্রোহ দমন করতে না পারেন, তবে ২০২৯ সালের আগেই ব্রিটেনকে হয়তো আরও একটি আগাম নির্বাচন কিংবা নতুন কোনো প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখতে হতে পারে। ওপিনিয়ন রিসার্চ সংস্থা ‘মোর ইন কমন’-এর ইউকে ডিরেক্টর লিউক ট্রিলের মতে, ২০১৬ সালের পর থেকে ব্রিটেনের প্রতিটি ভোটই আসলে ব্যবস্থার পরিবর্তনের পক্ষে ছিল। জনগণ আধুনিক ব্রিটেনের বর্তমান কাঠামো নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, আর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসাতেই এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে।

সূত্র: সিবিসি নিউজ

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ