রডের দাম টনে বেড়েছে ১৫ হাজার টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৯ এপ্রিল) : কনটেইনার পরিবহনে উচ্চ ভাড়াসহ একাধিক কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের (রিসাইক্লিং) চরম সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশের বাজারে ইস্পাতের দাম প্রায় প্রতিদিন বাড়ছে। দেড় মাসের ব্যবধানে লোহার দাম প্রতি টনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেড়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেড় মাস আগে প্রতি টন রড ৭৮ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
বুধবার (৮ এপ্রিল) প্রতি টন জেডএসআরএম কোম্পানির রড ৯২ হাজার ৫০০ টাকা, এসএস স্টিল ৯২ হাজার টাকা, এইচএম স্টিল ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা, কেএসআরএম ও জিপিএইচ ইস্পাত ৯৫ হাজার ৫০০ টাকা, একেএস স্টিল ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা ও বিএসআরএম ৯৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
চট্টগ্রামের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান সেভেন প্রপার্টিজের পরিচালক শিরিন আকতার বলেন, লোহা হলো নির্মাণশিল্পের একটি অন্যতম উপকরণ। হঠাৎ করে এই পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো বেকায়দায় পড়বে। লোহার দাম আরও বাড়তে থাকলে অনেক কোম্পানি পথে বসবে। বিষয়টি সরকারের আমলে নেওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকার মোহাম্মদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আসলাম বলেন, তিন থেকে চার মাস আগে রড, সিমেন্টের বাজার ভালো ছিল, সুবিধাজনক ছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কোম্পানিগুলো দাম বাড়িয়েছে। এ কারণে বেচাকেনা তেমন একটা নেই বললেই চলে। অনেকে এসে দাম দেখে চলে যায়।
দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এইচএম স্টিলের পরিচালক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, বর্তমানে লোহার রডের দাম বাড়ার বেশ কয়েকটি কারণ হয়েছে। গত দেড় মাস ধরে স্ক্র্যাপ লোহার দাম বাড়ছে। এ সময়ে মধ্যে স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টনে ৭০ থেকে ৮০ ডলার পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
অপরদিকে জাহাজের ভাড়া বা ফ্রেইট কমে যাওয়ার কারণে ২০১৫ থেকে ১৮ সাল পর্যন্ত অনেক জাহাজ মালিক দেউলিয়া হয়ে যান। সে সময় জাহাজ মালিকরা জাহাজের লাইফ টাইম শেষ হওয়ার অনেক আগেই কম দামে স্ক্র্যাপ হিসেবে তাদের জাহাজ বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
এর কয়েক বছর পর বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি দেখা দিলে নতুন করে জাহাজ নির্মাণ আর গতি পায়নি। যে কারণে বর্তমানে স্ক্র্যাপ জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। এদিকে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জাহাজের ফ্রেইট বেড়ে গেছে। ফলে জাহাজ মালিকরা তাদের অনেক পুরোনো জাহাজ ডকিং করে আবারও সাগরে ভাসাচ্ছেন। অপরদিকে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক
জাহাজ মালিক কিছু তেল পরিবহনকারী পুরোনো ট্যাংকারকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। দাম বাড়লে ওই সব মজুতকৃত তেল বিক্রি করবে। অথচ ওই সব ট্যাংকার স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। যে কারণে স্ক্র্যাপের বাজার দিন দিন বাড়ছে। আর লোহার অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হলো স্ক্র্যাপ। তাই লোহারও দাম বাড়ছে। গত দেড় মাসে পাইকারি বাজারে লোহার দাম প্রতি টনে ১১ হাজার থেকে বেড়ে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
এদিকে সাম্প্রতিক এক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় বিশ্বজুড়ে জাহাজ স্ক্র্যাপ করার হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক শিপিং এবং রিসাইক্লিং ডেটা সোর্স (যেমন জিএমএস, বিআইএমসিও ও ক্লার্কসন্স) থেকে প্রাপ্ত ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে যেখানে ৩২১টি বড় জাহাজ স্ক্র্যাপ করা হয়। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে সেই গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে বাজারে স্ক্র্যাপযোগ্য জাহাজের সরবরাহ গত কয়েক বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সে জাহাজ স্ক্র্যাপ করা হলেও বর্তমানে ২০২৬ সালের এপ্রিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অনেক মালিক তাদের ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী জাহাজগুলোও সমুদ্রে পণ্য নিয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছে।
জেনেটা (Xeneta) এবং বিআইএমসিও (BIMCO)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, জাহাজের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মালিকরা পুরোনো জাহাজ স্ক্র্যাপ না করে উচ্চ ভাড়ায় চালাচ্ছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) কর্তৃক হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার ফলে এখন কেবল নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙা যায়। এ কারণে অনেক সাধারণ ইয়ার্ড জাহাজ কিনতে পারছে না। কিছু কিছু ইয়ার্ড বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; যা সরবরাহে আরও চাপ তৈরি করেছে। বিজনেস রিসার্চ ইনসাইটের তথ্যও একই কথা বলছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী রিসাইকেল করা ইস্পাতের চাহিদা বাড়লেও পুরোনো জাহাজের জোগান কমে গেছে। অথচ মোট ইস্পাত উৎপাদনের ৬০ শতাংশ জোগান আসে পুরোনো জাহাজ থেকে। যে কারণে ইস্পাত তথা লোহার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
মনোয়ারুল হক/
