আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা অগ্রগণ্য
রাজশাহী প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (২৯ অক্টোবর): মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিয়ে এবং জনগণের পূর্ণ আস্থা অর্জন করে পুলিশ বাহিনীকে সত্যিকার অর্থেই ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
আজ সকালে রাজশাহী জেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)’-এর ৬ মাস মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেবাপ্রার্থী সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি পুলিশকে আরও বেশি আন্তরিক হওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, সব ধরনের ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষকে আইনি সেবা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একটি দক্ষ, আধুনিক ও মানবিক সেবামুখী বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যানবাহন ক্রয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে।
নবীন পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের অপেক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া এবং নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার পবিত্র দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। অতীতের নানা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধরনের বৈষম্য কিংবা অন্যায়ের পথ না মাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। পুলিশের পোশাক ও অর্পিত দায়িত্বকে স্রেফ একটি সাধারণ চাকরি না ভেবে দেশের মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এক মহান অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
বর্তমান সময়ের পরিবর্তিত অপরাধের ধরন তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চিরায়ত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, আর্থিক প্রতারণা, মাদক পাচার, মানব পাচার এবং বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জটিল অপরাধের বিস্তার রোধে প্রথাগত ধারণার বাইরে গিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক পন্থায় তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক জ্ঞান অর্জনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেন তিনি।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ, দুর্ব্যবহার বা পক্ষপাতিত্বের পথ পরিহার করে শতভাগ পেশাদারিত্ব, দক্ষতা এবং মানবিক পুলিশিংয়ের চর্চা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ পুলিশের বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে কাজের বিশাল সুযোগ রয়েছে। তবে কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা, নৈতিকতা পরিপন্থী কাজ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটলে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো. মাইনুল হাসান, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. রেজাউল আলম সরকার এবং রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ, প্রশিক্ষণার্থীদের অভিভাবক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে মন্ত্রী বর্ণাঢ্য প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে তিনি ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ) থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক ও পুরস্কার তুলে দেন। অনুষ্ঠানে এএসপি প্রবেশনার মো. মাহবুব হোসেন প্যারেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখ্য, এবারের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্টের ৮৪ জন এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ)-এর ১৬২ জন—মোট ২৪৬ জন নবীন প্রশিক্ষণার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তব কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন।
এবারের ব্যাচগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে যারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন তারা হলেন—
২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট: বেস্ট সার্জেন্ট ওমর ফারুক, বেস্ট একাডেমিক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ সাইফুল ইসলাম এবং বেস্ট শ্যুটার আসাদুজ্জামান।
৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (২০০৬ ব্যাচ): বেস্ট ক্যাডেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বেস্ট একাডেমিক মো. বোরহানুল ইসলাম, বেস্ট ইন ফিল্ড অ্যাক্টিভিটিজ দেওয়ান গোলাম রসুল এবং বেস্ট শ্যুটার মো. কামাল গনি।
মনোয়ারুল হক/
