ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে ইসি
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৮ অক্টোবর): একটি মাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়াই কেবল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাজ নয়; বরং দেশের প্রতিটি নির্বাচনে একই উচ্চ মান বজায় রাখার টেকসই সংস্কৃতি গড়ে তোলাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এ কথা বলেছেন।
তিনি জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, তা বহাল রাখার পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তা কঠোরভাবে বজায় রাখা হবে। সিইসি উল্লেখ করেন, ‘শুধুমাত্র একটি ভালো নির্বাচন আয়োজন করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভালো নির্বাচনের স্থায়ী সংস্কৃতি তৈরি করাই আমাদের প্রধান ব্রত।’
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও একই মানের বা ক্ষেত্রবিশেষে আরও উন্নত উপায়ে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য তিনি সব মহলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
চাপমুক্ত ও স্বাধীন পরিবেশে ইসির কার্যক্রম নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে নিজেদের দৃঢ় অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে সিইসি জানান, এই অনড় মানসিকতাই কমিশনকে বিভিন্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রবাসী ও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা কর্মীদের পোস্টাল ভোটিং, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং কারাবন্দীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কমিশনের সদিচ্ছার কারণেই এসব বড় কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি। আসন্ন ইউপি নির্বাচন নিয়েও তিনি পূর্ণ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জানান যে, কমিশনের ওপর কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ নেই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ভোট সুষ্ঠু করতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নভেম্বরেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে চলতি নভেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ে বসার জোরালো পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।
সিইসি বলেন, যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে না, তবুও প্রার্থীদের পেছনে রাজনৈতিক দলের সমর্থন থাকতে পারে। তাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল করতে রাজনীতিবিদদের সহযোগিতা অপরিহার্য। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করতে অবাধ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই।’
ইউপি নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা ও কঠোর আচরণবিধি আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিইসি। ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইনি মেয়াদ উত্তীর্ণ এবং আদালতের নির্দেশনা সাপেক্ষে প্রতিটি ধাপে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ইউপিতে ভোটগ্রহণ হতে পারে। ইউপি নির্বাচনে অতীতের সহিংসতার কথা মাথায় রেখে আচরণবিধির প্রয়োগ আরও কঠোর করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারির অংশ হিসেবে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কোনো ধরনের অনিয়ম বা ছাড় দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন সিইসি।
তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিগত নির্বাচনগুলো নিয়ে মানুষের আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। ভোটার তালিকা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হালনাগাদ করার ফলে প্রায় ১০ লাখ নতুন নারী ভোটার যুক্ত হয়েছেন এবং ২১ লাখের বেশি মৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের অংশগ্রহণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। জাতীয় নির্বাচনে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানের কথা স্মরণ করে সিইসি বলেন, আগামীতেও এই অংশীদারত্ব বজায় রাখতে হবে।
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি জানান, সংবাদকর্মীদের জন্য ইসির দরজা সবসময় খোলা। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার স্বার্থে নীতিমালা অনুযায়ী তাদের পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। জাতীয় সাংবাদিকদের কার্ড ইসি থেকে এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের কার্ড প্রেস ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তারা প্রদান করবেন।
দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিকল্পনা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনিয়ম রোধ ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি সক্রিয় থাকবে। কালো টাকা ও ভোট কেনাবেচার অভিযোগ পেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাস্তবতা ও আইনগত প্রক্রিয়া বিবেচনা করে দেশের সমস্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, কারণ অন্যান্য অনেক স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যক্রমের সঙ্গে ইউপি নির্বাচন সরাসরি জড়িত। ইউপির পরপরই পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ রয়েছে, তবে এসএসসি পরীক্ষা ও বর্ষা মৌসুমের কথা মাথায় রেখেই সময় নির্ধারণ করা হবে।
নারী ও তরুণ ভোটারদের বিশেষ গুরুত্ব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সিইসি বলেন, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার কারণে নারীরা নির্বাচনে আসতে দ্বিধাবোধ করেন। এ অবস্থার পরিবর্তনে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা জরুরি। জাতীয় নির্বাচনে ২০৩০ সালের মধ্যে দলগুলোতে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আইনি লক্ষ্য রয়েছে।
পাশাপাশি, তরুণ সমাজকে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তাদের ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে, একটি সুন্দর, গ্রহণযোগ্য ও মানসম্মত স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দিতে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, গণমাধ্যমকর্মী ও ভোটারসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সূত্র: বাসস
মনোয়ারুল হক/
