বিচার ব্যবস্থাকে মানুষের আস্থার জায়গায় সুদৃঢ় করতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৯ অক্টোবর): বিচার বিভাগের ওপর সাধারণ মানুষের যে আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তাকে আরও শানিত, বেগবান এবং উন্নত করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনে থাকা আস্থার পরিবেশ পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা তাদের অন্যতম লক্ষ্য।

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের কনফারেন্স রুমে দুটি ই-পারিবারিক আপিল আদালতের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিচারাধীন মামলার জট ও বিচারকদের কর্মতৎপরতা

অনুষ্ঠানে মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইনমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ছাড়িয়েছে। অথচ মাত্র ২ হাজার ৩০০ জন বিচারকের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি করা একপ্রকার ‘পাহাড়ে ওঠার মতো কঠিন প্রতিবন্ধকতা’। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় মহানগরগুলোতে এই চাপ আরও তীব্র।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তনের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যেসব জেলায় মামলার জট বেশি, সেখানে শুধু নিয়মমাফিক চাকরি করার মানসিকতার বাইরে গিয়ে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে দক্ষ ও ‘জুডিশিয়াল অ্যাকটিভিজম’ দেখাতে সক্ষম বিচারকদের বাছাই করে পদায়ন করা হবে। কোনো কোনো আদালতে বিচারকরা সংক্ষিপ্ত সময় অফিস করছেন—এমন অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা আরাম-আয়েশে চাকরি করতে চান, তাদের সেরকম জায়গাতেই বদলি করা হবে।

বিচার বিভাগের সামনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যালেঞ্জ

ভবিষ্যতের বিচারিক কার্যক্রমের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে এআই ব্যবহার করে রায় লেখা, জবানবন্দি গ্রহণ কিংবা সাক্ষর নেওয়ার প্রবণতা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এআই যেভাবে মানুষের কণ্ঠস্বর ও অবয়ব নিখুঁতভাবে ক্লোন করতে সক্ষম, তাতে বিচারকদের জন্য তা বড় পরীক্ষা হয়ে দেখা দেবে। এই প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণ বিচারকদের আরও বেশি ডিজিটাল দক্ষ ও সচেতন হওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

বিচার বিভাগে ডিজিটালাইজেশন ও ই-জুডিশিয়ারি

কারাগার থেকে প্রতিদিন আদালতে বন্দি আনা-নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে ডিজিটাল হাজিরা চালুর পরিকল্পনার কথা জানান আইনমন্ত্রী। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এটি শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া ই-বেইলবন্ড চালুর সুফল সাধারণ মানুষ পেতে শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে ই-জুডিশিয়ারির আওতায় আনতে পারলে সময় ও অর্থ—উভয়ই সাশ্রয়ী হবে। প্রি-কেস মেডিকেশনের মাধ্যমে মামলা দায়েরের হার কমানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ৩০টি জেলায় চালু থাকা এই প্রক্রিয়ায় সাফল্যের হার বর্তমানে ৬২ শতাংশের বেশি।

আইন প্রণয়ন ও সংবিধানে জনমত সম্পৃক্ততা

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী জানান, মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম সংক্রান্ত আইন কিংবা সাইবার নিরাপত্তা আইনের সংশোধনী—সবক্ষেত্রেই বিভিন্ন অংশীজনের মতামত বা পাবলিক কনসালটেশন নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী, শিক্ষক, আইনজীবী, শহীদ পরিবার এবং গুম হওয়া ব্যক্তিদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সবার অংশগ্রহণে একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে এগিয়ে নিতে চায় সরকার।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়াসহ বিশিষ্টজনেরা।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ