ওয়াসা প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে অপসারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৯ অক্টোবর): প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নকাজে বছরের পর বছর দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। আগামী দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন বা অগ্রগতি না আসলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ব্যর্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে বলে জোরালো সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে অবস্থিত ঢাকা ওয়াসা ভবন সম্মেলন কক্ষে ঢাকা ওয়াসার সার্বিক কার্যাবলি নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
চলমান প্রকল্পগুলোর কাজের গতি বহুগুণ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী নির্দেশনা দেন যে, দাশেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী এবং বারিধারা এলাকার পাইপলাইন সংযোগের কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।
এর পাশাপাশি, পূর্বাচল নতুন শহর এলাকায় একটি শক্তিশালী পানি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে দ্রুত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী ওয়াসাগুলোতে পরিচালনা পর্ষদ বা বোর্ড বহাল রাখার বিধান থাকলেও সরকার যেকোনো মুহূর্তে তা পুনর্গঠন কিংবা ভেঙে দিতে পারে। মন্ত্রণালয়ের নিবিড় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই ওয়াসা বোর্ডগুলো জনসেবামূলক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতের কাজে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ সৃষ্টি করছে, যা সামগ্রিক কাজের গতি মন্থর করে দিচ্ছে।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের কথা বিবেচনা করে সরকার প্রচলিত আইন সংশোধন করার মাধ্যমে দেশের সকল ওয়াসা থেকে বোর্ড বা পর্ষদ সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে তিনি সভাকে জানান।
ওয়াসার সার্বিক কার্যক্রমে ধীরগতি লক্ষ্য করে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমানে রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা এবং সরবরাহ উভয়ই সমপরিমাণ অর্থাৎ ৩১৪ কোটি লিটার। শহরাঞ্চলে সাধারণ মানুষ ও বসতির সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পানির চাহিদাও পাল্লা দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। কিন্তু বিগত সাত মাসের ব্যবধানে ওয়াসার দৈনন্দিন কার্যক্রমে নতুন বা উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্ভাবন কিংবা আশানুরূপ প্রকল্পের গতি লক্ষ্য করা যায়নি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
নগরবাসীর পানির কোনো ধরনের সংকট দেখা দিলে তার সম্পূর্ণ দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই এসে বর্তায়। তাই ঢাকাবাসীর এই নানামুখী চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি নির্দেশ দেন।
পানির মূল উৎস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, বর্তমানে গ্রাহকপর্যায়ে যে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, তার প্রায় ৭৪ শতাংশই আসছে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে এবং মাত্র ২৬ শতাংশ উপরিভাগের পানি। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাসের উদ্দেশ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বর্তমান হার কমিয়ে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সারফেস ওয়াটার বা উপরিভাগের পানিভিত্তিক প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত সমাপ্ত করার জোর তাগিদ দেওয়া হয়।
ওয়াসার নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিকায়নের রূপরেখা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি বাণিজ্যিক সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রাহকসেবার মান অটুট রেখে নিজেদের রাজস্ব আয় আরও বহুগুণ বাড়াতে হবে। এর ফলে বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকেই বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে মিটার রিডিং এবং বিলিং প্রক্রিয়ায় আধুনিক অটোমেশন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
পাশাপাশি, আগামী ২০৫০ সালের আনুমানিক চাহিদাকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি আধুনিক রূপ দিতে একটি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামো বা অর্গানগ্রাম প্রস্তুত করে দ্রুত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেন তিনি।
শহরের ভেতরে গড়ে ওঠা সকল অবৈধ ও চোরা পানির লাইন কঠোর হাতে চিহ্নিত করে দমন করার নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে কোনো প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক এবং কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা কোনোভাবেই ব্যাহত করা যাবে না মর্মে সিবিএ এবং অন্যান্য কর্মচারী সংগঠনগুলোকে কঠোরভাবে সতর্ক করেন তিনি। একইসঙ্গে, ব্রাশ বা শেভ করার সময় অহেতুক পানির ট্যাপ খোলা না রেখে অত্যন্ত সচেতনভাবে পানি ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে এবং পানির অপচয় রোধে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচার চালাতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ঠিক আগামী দুই মাস পর তিনি পুনরায় ওয়াসার সার্বিক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে আসবেন এবং এর মধ্যে কাজের একটি দৃশ্যমান ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চান, যাতে নগরবাসীকে পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক একটি অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামান। এ সময় সভায় ঢাকা ওয়াসার উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন ও সিবিএ-র শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
মনোয়ারুল হক/
