খেলাপি ঋণ কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১০ অক্টোবর): দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করতে এবং খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে নতুন রূপরেখা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা ও সংস্কার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান। বৈঠকে দেশের আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা (৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ)। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা, আর হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা ও আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা ও তদারকি ব্যবস্থা আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেই ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে প্রতি তিন মাস অন্তর নিয়মিত বৈঠক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব বৈঠকে ঋণ আদায়ের প্রধান অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে। ব্যাংকার্স সভাতেও শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।
পাশাপাশি, উচ্চ খেলাপি ঋণধারী ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ ‘ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশল’ নির্দেশিকা এবং হালনাগাদ ‘ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস-৯) অনুসরণ করে ‘এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস’ বা প্রত্যাশিত ঋণক্ষতি পদ্ধতিতে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন বা সংস্থান সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষতি আগে থেকেই নিরূপণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের আইনি দিকগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম এই উদ্যোগগুলোকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছেন, ব্যাংক খাতে ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে এই আলোচনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংক উভয়ের জন্যই কার্যকর প্রণোদনা তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ উদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য প্রণোদনা নীতিমালা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে ভালো ও নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করা হবে, যাতে সাধারণ গ্রাহকরা নিয়মিত ঋণ পরিশোধে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকের পুরো ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো ঋণ অনুমোদন, পর্যবেক্ষণ ও শ্রেণিকরণের প্রতিটি ধাপে কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ সৃষ্টির মূল কারণগুলো গোড়াতেই উৎপাটিত করা।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কয়েকটি নতুন আইন প্রণয়ন ও সংশোধনের কাজ চলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬: খসড়া প্রস্তুতের পর বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে গত ২৪ আগস্ট এটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং গত ২০ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬: ঋণ আদায় প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করতে এই আইন যুগোপযোগী করার কাজ চলছে।
দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬: খেলাপি ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে এই নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেউলিয়াত্ব ও দেউলিয়া কার্যক্রম আইন, ২০২৬: ১৯৯৭ সালের পুরোনো দেউলিয়াত্ব আইন বাতিল করে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই আধুনিক আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আইএফসি-এর সহায়তায় এর ইংরেজি খসড়া ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে এবং বর্তমানে এটি বাংলায় অনুবাদের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সার্বিক পরিকল্পনা ও কঠোর আইনি সংস্কারগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। সূত্র: বাসস
মনোয়ারুল হক/
