জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক: দেশসেরা প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (৪ অক্টোবর): প্রাথমিক শিক্ষায় অনন্য অবদান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬’-এ দেশের সেরা প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে এই গৌরবময় পদক গ্রহণ করেন।

শিক্ষার মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক বিলকিসের রয়েছে বিশেষ কর্মপদ্ধতি। তিনি প্রতিটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও মেধার জায়গাটি গভীরভাবে মূল্যায়ন করেন। এরপর সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ, বাড়তি মনোযোগ এবং বিশেষ পরিচর্যা নিশ্চিত করেন। তাঁর এই সুচিন্তিত ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি লাভ করেছে।

জাতীয় পর্যায়ে এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পেছনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি বহুবার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। এর আগে তিনি ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, ৮ বার নারায়ণগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং দুই বার ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

এই বড় অর্জনে নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বি আর বিলকিস বলেন, ‘যেকোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; এটি আমার বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সোনারগাঁ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই সম্মাননা আমাকে ভবিষ্যতে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধি করতে এবং শিশুদের মেধা বিকাশে আরও বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।’

দীর্ঘদিন ধরে ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ঝরে পড়ার হার কমানো, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

রোববার সকালে সরেজমিন বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, ঘড়ির কাঁটা সকাল ৯টা ছুঁতেই প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে শিক্ষার্থীদের ভেতরে প্রবেশ করাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক বিলকিস। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও শারীরিক কসরত শেষে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে প্রবেশ করে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার পরপরই তিনি শিক্ষকদের নিজ দায়িত্বে পাঠদানে নিয়োজিত করেন এবং প্রতিটি ক্লাসের নিয়মিত খোঁজখবর নেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বি আর বিলকিস ১৯৯৩ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। পরবর্তীতে আবার পরীক্ষার মাধ্যমে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। তাঁর জন্ম সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে। তিনি উপজেলার পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২০ জন এবং তাদের উপস্থিতির হার শতকরা ৯৮ থেকে ৯৯ ভাগ। বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষক সংখ্যা ১৩ জন। পাঠদান কার্যক্রমে ভিন্নতা আনতে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের তিন স্তরে— উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া— এই ভাগে ভাগ করা হয়। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়তে ও লিখতে সক্ষম। বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে অভিভাবকদের কাছ থেকেও নিয়মিত সহযোগিতা পাওয়া যায়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও নৈতিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে ‘সততা স্টোর’ ও ‘পরামর্শ বক্স’ চালু রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশে বি আর বিলকিস নানা অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। শিক্ষক সংখ্যার অনুপাতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি নিজ দায়িত্বে রাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নেন এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা উপকরণ প্রদান করেন। খেলাধুলা, গান, ব্যায়াম ও গল্প বলার চর্চার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব ও ইংরেজি ক্লাব গঠন করে নিয়মিত অলিম্পিয়াড এবং বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। প্রতি শনিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাঠদানকে আরও গতিশীল করতে শ্রেণিভিত্তিক মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে বাড়ির কাজ সরবরাহ করা হয়, যাতে স্কুল থেকে লিখে না আনলেও অভিভাবকেরা সহজে তা জানতে পারেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শামীমা আক্তার জানান, প্রধান শিক্ষকের শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি হলো তাঁর সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও শিক্ষাবান্ধব মনমানসিকতা। সময়ের কাজ সময়ে করতে পছন্দ করা এই শিক্ষক নিজের জন্য কোনো সময় না রেখে পুরোটাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করেন। তাঁর অসামান্য নেতৃত্বেই ২০২৫ সালে এই বিদ্যালয় থেকে ৩৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩০ জন বৃত্তি লাভ করে।

অপর শিক্ষক মাহমুদা আক্তার উল্লেখ করেন, তিনি একসময় এই বিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী ছিলেন এবং আজ এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর চোখে তিনি একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং শিক্ষায় নিত্যনতুন ইনোভেটিভ আইডিয়া নিয়ে কাজ করা মানুষ। নিয়মিত সভা ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তিনি পাঠদানকে সর্বদা ফলপ্রসূ করে তোলেন।

শিক্ষার্থীরা জানায়, প্রধান শিক্ষক তাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন। ভাষা ক্লাব, ছাদ বাগান তৈরি ও পরিচর্যা থেকে শুরু করে সব কার্যক্রমে তাঁরা তাঁকে আনন্দের সঙ্গে সহযোগিতা করে থাকে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কাজের প্রতি আরও বেশি উৎসাহিত করার জন্য প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এই জাতীয় শিক্ষা পদক প্রদান করা হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় ধাপ পেরিয়ে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পরেই চূড়ান্তভাবে জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ