শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আর প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৩০ সেপ্টেম্বর): শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আর প্রতিবাদের ঝড়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। শ্রেণিকক্ষ সংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ঘাটতি এবং দীর্ঘ ক্লাস সূচির প্রতিবাদে দেশজুড়ে স্কুল অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রায় ৪৪০ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটক হওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই শিশু কিংবা কিশোর। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশজুড়ে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। যদিও এই সংখ্যাটি চূড়ান্ত নয়। তবে এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দেশটির প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ৪০০টি বিদ্যালয় বিক্ষোভ কিংবা বিশৃঙ্খলার মুখোমুখি হয়। গত সপ্তাহে প্যারিসে এই আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চলীয় শহর লিলের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, বোতলসহ বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করে। বাসের অপেক্ষাকেন্দ্র ও বিজ্ঞাপনের বোর্ড ভাঙচুর করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এই পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, ‘মুখে কাপড় ঢেকে, হাতে বিভিন্ন বস্তু নিয়ে বিক্ষোভে হাজির হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানোর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।’ তিনি জানান, মঙ্গলবারের সংঘাতের সময় পুলিশের ওপর অন্তত সাতবার হাইড্রোক্লিক অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হয়। এই সংঘর্ষের ঘটনায় দেশজুড়ে ৪৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

বোর্দো, রেন, নঁত ও মার্সেইয়ের মতো প্রধান শহরগুলোতেও শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। উত্তর প্যারিসের লামার্তিন লাইসেতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর রুটিনের বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানায়। তাদের একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা; এটি ঘুমের সময়ের চেয়েও দীর্ঘ ক্লাস।’

এদিকে প্যারিসের উপকণ্ঠ সেইন-সাঁ-দনি এলাকায় লিসে পল-এলুয়ারের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভে শত শত শিক্ষার্থীর সঙ্গে অংশ নেন স্থানীয় মেয়র বালি বাগায়োকো। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে এই আন্দোলনকে ‘সম্পূর্ণ বৈধ’ বলে আখ্যা দেন তিনি। পাশাপাশি নিম্নআয়ের অঞ্চলগুলো ধনী এলাকার তুলনায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা কম পায় বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ভিড় বাড়লে দাঙ্গা পুলিশ লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়াকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ বলে অভিহিত করেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের বাইরে আতশবাজি ফোটানো, আগুন জ্বালানো কিংবা শিক্ষার্থী, কর্মী ও পুলিশকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে সরকারের এই কঠোর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবুয়াঁর (এলএফআই) প্রধান জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ। তার মতে, আন্দোলনকারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই ক্ষতিকর নয়। লেকর্নু সরকার তাদের দমনে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে এবং এর পেছনে ‘বর্ণবাদী উদ্দেশ্য’ রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জবাবে মেলঁশোঁর বক্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। তিনি বলেন, তরুণদের সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের শান্ত রাখা জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে ব্যবহার করা অন্যায়। এছাড়া মেলঁশোঁর তোলা বর্ণবাদের অভিযোগকে তিনি ‘অপমানজনক’ বলেও মন্তব্য করেন।

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারের বাজেট পরিকল্পনার প্রতিবাদে ধর্মঘটে গেছেন ফ্রান্সের বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরা। ওই বাজেটে সরকারি ব্যয় ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। মঙ্গলবার বিভিন্ন সরকারি খাতের কর্মীরা কর্মবিরতি পালন করেন। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উচ্চবিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ‘ইউনিয়ন সিন্দিকাল লিসেনে’র (ইউএসএল) সভাপতি রিয়াদ রানি এর আগে দেশের সব উচ্চবিদ্যালয় অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন। তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের সব সময় শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।

রানি বলেন, শিক্ষার্থীরা মূলত সম্পদের ঘাটতি, ৩২ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষক-কর্মী সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। উচ্চবিদ্যালয়ের বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে পুলিশকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়ায় স্বরাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কথা বলছি। অথচ সরকারের একমাত্র প্রতিক্রিয়া হলো দমন-পীড়ন, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। শিক্ষার্থীরা যখন একটি ন্যায্য ও সমতার পরিবেশ চাইছে, তখন তাদের দমনে অপরাধ দমন ইউনিট ও দাঙ্গা পুলিশ পাঠানো হচ্ছে।’ তিনি জানান, অনেক শিক্ষক ও স্কুলকর্মী শিক্ষার্থীদের পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচাতে মানবপ্রাচীর তৈরি করে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন।

এদিকে শিক্ষক ইউনিয়ন ‘ফেডারেশন সিন্দিকাল ইউনিতেয়ার’র (এফএসইউ) মহাসচিব ক্যারোলিন শেভে মধ্য প্যারিসের একটি মিছিলে যোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের হতাশার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি বলেন, ‘তারা ঠিক আমাদের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। তাদের শ্রেণিকক্ষগুলো অতিরিক্ত শিক্ষার্থী পূর্ণ। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক সময় পর্যাপ্ত শিক্ষকও থাকে না। শিক্ষকরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি, শিক্ষার্থীরাও তা দেখছে এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা ক্ষুব্ধ।’ সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ