ট্রাম্পের ক্ষমতা নিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে সীমাবদ্ধতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২৫ সেপ্টেম্বর): জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক—বিশ্বমঞ্চে মার্কিন আধিপত্য নতুন করে জানান দিতে চলতি সপ্তাহে বেশ নিবিড় কূটনৈতিক কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সাম্প্রতিক এই কর্মকাণ্ডগুলো ট্রাম্পের ক্ষমতা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকেই বরং আরও স্পষ্ট করে তুলেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘায়িত ইরান সংকট, দেশের বাজারে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জনসমর্থনে ভাটা, মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে শীতল সম্পর্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে চীনের ক্রমবিকাশ—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এখন বহিমুখী জটিলতার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিশ্বনেতারা আগের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ট্রাম্পের নীতির প্রতি অনমনীয় ও প্রতিরোধী মনোভাব দেখাচ্ছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনৈতিক এজেন্ডাগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে কি না, সেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। আসন্ন নভেম্বরে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কার্যপরিধি আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক গবেষকরা।
গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের কড়া পররাষ্ট্রনীতি আবারও জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন। বিশ্বযুদ্ধের পরের আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রতি তার মনোভাব যে অনেকটাই বদলে গেছে, তা তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশ্বশান্তি রক্ষার মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প হুমকি দেন যে, ইরান যদি কোনো চুক্তিতে না আসে তবে দেশটির চরম পরিণতি অনিবার্য। ভেনেজুয়েলার মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার নীতিকেও তিনি সমর্থন করেন। এমনকি বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও তিনি উড়িয়ে দেননি।
তবে জাতিসংঘে দেওয়া তার এই কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় বৃহস্পতিবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বৈঠকে; যেখানে ট্রাম্পকে বেশ সংযত মেজাজে দেখা গেছে।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সীমিত অর্জন
চীনা প্রেসিডেন্টের এই রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করা হলেও বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তাইওয়ান কিংবা ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়েই উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। এই বৈঠকের সবচেয়ে দৃশ্যমান আউটকাম ছিল দুই দেশের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো।
বেইজিংয়ের সরকারি গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বৈঠকে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানানো থেকে বিরত থাকার জোরালো আহ্বান জানান। স্বায়ত্তশাসিত এই দ্বীপটিকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে চীন, যা ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সবচেয়ে স্পর্শকাতর কূটনৈতিক বিষয়গুলোর একটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরল খনিজ সম্পদের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণও ট্রাম্পের পূর্বের কঠোর অবস্থানকে কিছুটা নমনীয় করতে বাধ্য করেছে। প্রযুক্তি ও অটোমোবাইল শিল্পে অতীব প্রয়োজনীয় এসব খনিজ পদার্থ রপ্তানিতে চীন যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন এ প্রসঙ্গে বলেন, ট্রাম্প এমন একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থায় ফিরে যেতে চান যেখানে শক্তি প্রদর্শনই শেষ কথা। কিন্তু শি জিনপিং এবং চীনের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক শক্তির সামনে ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অবশ্য হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অচলাবস্থার তাত্ত্বিক এই ধারণা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তার দাবি, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ট্রাম্পের ভাষণ বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বড় সাফল্যেরই সাক্ষ্য দেয়।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা
ট্রাম্পের পুরো কূটনৈতিক সপ্তাহের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া হয়ে ছিল তেহরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে প্রায় সাত মাস ধরে এই সংঘাত চলছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের একটানা প্রতিরোধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্প এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মার্কিন শক্তিকে আগের তুলনায় বেশি শক্তিশালী বলে দাবি করলেও, এই যুদ্ধ খোদ মার্কিন রাজনীতিকেই চরমভাবে বিভক্ত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনে থাকা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভিত্তিকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে।
মিত্রদের প্রকাশ্য অনীহা ও সমালোচনা
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রকে জোরালো সহায়তা দেওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও এশিয়ার প্রথাগত মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানালেও বেশিরভাগ দেশই তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনেও আমেরিকার অনেক মিত্র দেশের নেতারা ট্রাম্পের একতরফা নীতির মৃদু ও পরোক্ষ সমালোচনা করেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিশ্বকে ‘জঙ্গলের রাজত্বে’ ফিরিয়ে নেওয়ার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, বিশ্ববাসীর সামনে আজ জবরদস্তিনির্ভর শক্তি ও একটি সুশৃঙ্খল সভ্য সমাজের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সময় এসেছে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে জানান, তার দেশের সমুদ্রসীমায় যুদ্ধজাহাজ বা রণতরী মোতায়েনের চেয়ে বরং অপরাধচক্রে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করাটাই বেশি জরুরি।
যদিও হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা মিত্রদের এসব মন্তব্যকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ হিসেবে মানতে নারাজ। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাহ্যিক লোকদেখানো কথার চেয়ে কাজের ফলাফলে বেশি বিশ্বাসী এবং অনেক বিশ্বনেতার প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত আলোচনার সুরের মিল থাকে।
রাশিয়া-ইউক্রেন ও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতেও বাধার প্রাচীর
রাশিয়া এবং ইউক্রেনকে সীমিত জ্বালানি অবকাঠামো সংক্রান্ত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করার ট্রাম্পের কূটনৈতিক উদ্যোগও আশানুরূপ ফল দেয়নি।
পাশাপাশি, গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে কিছু চুক্তি সম্পন্ন হলেও তা ট্রাম্পের প্রাথমিক দাবি—‘গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা বা অধিকার অর্জন’—এর চেয়ে বহু দূরে রয়েছে। অতীতে সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক জবরদস্তির মাধ্যমে এই দ্বীপটি কিনে নেওয়া বা দখল করার হুমকিও তিনি দিয়েছিলেন।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ইয়ান ব্রেমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ঠিক এক বছর আগেও যে সমস্ত দেশ ট্রাম্পকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পেত, আজ সেই কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ইরান এবং রাশিয়া—সবার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে স্পষ্ট ‘না’ বলে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে।
এমনকি জাতিসংঘে নিজের বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই বিশ্বমঞ্চে তার প্রকৃত ক্ষমতার পরিধি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে পুনঃনামকরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি একপর্যায়ে মন্তব্য করেন, ‘দেখা যাক আমার কোনো ক্ষমতা আদৌ আছে কি না। হয়তো আছে, হয়তো নেই। খুব দ্রুতই আমরা তা বুঝতে পারব।’
সূত্র : রয়টার্স
মনোয়ারুল হক/
