দেশকে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে চায় সরকার

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৫ সেপ্টেম্বর): জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর এবং কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে দল, মত, ধর্ম কিংবা বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশের নাগরিকদের বঞ্চিত বা ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র ককখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। টেকসই উন্নয়নের ধারাকে বেগবান করতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও নারীর ক্ষমতায়ন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার কেবল ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বরং অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রায়ন চায়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের প্রতিটি পরিবার ও শেষ প্রান্তের নাগরিক পর্যন্ত পৌঁছায়। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হওয়ায় নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারি পরিকল্পনার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং স্নাতক স্তর পর্যন্ত নারীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-স্বাস্থ্য কার্ডের মতো নানান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবারের নারী প্রধানের নামে বরাদ্দকৃত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এসব কার্ডকে একত্রিত করে একটিমাত্র ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।

শিক্ষা, মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থান

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলা বিশেষ স্থান জুড়ে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাতকে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মমুখী ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে জনপ্রিয় করতে সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। গত জুনে অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী দেশব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ এর বড় প্রমাণ।

প্রযুক্তি ও এলডিসি উত্তরণ

বর্তমান বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য সমান নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আজকের ডিজিটাল বৈষম্য যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে রূপ না নেয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর জোর দেন।

রোহিঙ্গা সংকট ও জলবায়ু ন্যায়বিচার

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়ে যাওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার ওপর সৃষ্ট চাপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সংকটের মূল উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাঁচতে কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজনের জোরালো দাবি জানান প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননসহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের উদ্যোগের কথা তিনি তুলে ধরেন।

শান্তি ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি

বিশ্বব্যাপী সংঘাত ও মানবিক সংকট নিরসনে কূটনীতি, পারস্পরিক আলোচনা এবং সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের অটল সমর্থনের কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের মূল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশ সর্বদা অঙ্গীকারবদ্ধ।

ভাষণের শেষ পর্যায়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই মূল মন্ত্র ধারণ করে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ