কাজ না করেই টাকা তোলার অভিযোগ বদরগঞ্জের ইউএনও ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে
রংপুর প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, (২৪ সেপ্টেম্বর): রংপুরের বদরগঞ্জে কোনো ধরনের কাজ না করেই কাগজে-কলমে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে ৩৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আঞ্জুমান সুলতানা ও উপজেলা প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সাধারণ বরাদ্দে ৯৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, উপজেলা উন্নয়ন তহবিলে ৮৯ লাখ টাকা এবং সংসদ সদস্যের (এমপি) বিশেষ বরাদ্দে ৩৯ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এসব বরাদ্দের বিপরীতে মোট ৪৩টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ের ২২টি প্রকল্প ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে করার কথা ছিল। ৩ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয় টেন্ডারের মাধ্যমে। গত ৩০ জুন ছিল এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ সময়। ওই নির্ধারিত তারিখের মধ্যেই কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে পুরো প্রকল্পের টাকা তুলে নেওয়া হয়।
তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, এমপির বিশেষ বরাদ্দের দুটি প্যাকেজে ২৭ লাখ টাকা এবং উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের একটি প্যাকেজে ১০ লাখ টাকার কোনো কাজই করা হয়নি। অথচ এর বিপরীতে ঠিকই টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ২৭ লাখ টাকার ওই দুটি প্যাকেজের কাজ ছিল পাঁচটি রাস্তায় এইচবিবিকরণ এবং ১০ লাখ টাকার প্যাকেজটি ছিল উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টিলের আলমারি সরবরাহ করার জন্য।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, রাধানগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লালদীঘির বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে আনিসুলের বাড়ি থেকে আউয়ালের বাড়ি পর্যন্ত এইচবিবিকরণ রাস্তার কোনো অস্তিত্বই নেই। একই অবস্থা গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীর মোড় থেকে মনো সরদারের ঈদগাহ মাঠ ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার। পাশাপাশি দামোদরপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঢুকঢুকির হাইস্কুল মোড় থেকে সরদার পাড়ার রাস্তারও কোনো কাজ করা হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই তিন রাস্তা ছাড়াও আরও দুটি রাস্তার এইচবিবিকরণের কাজ সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের স্টিলের আলমারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সরবরাহ করা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা। এমনকি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকার ২২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামেও ব্যাপক অনিয়ম ও নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের দাবি, দুই প্যাকেজের পাঁচটি রাস্তার মধ্যে কেবল একটি রাস্তায় এইচবিবিকরণের কাজ শেষ হয়েছে এবং স্টিলের আলমারিগুলো এখনো কেনা হয়নি। তবে এসব কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান উপজেলা প্রকৌশলী।
ভুয়া ভাউচার ব্যবহার করে টাকা তোলার অভিযোগ স্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘আমাদের কিছুই করার ছিল না। অর্থবছরের শেষ হওয়ার মাত্র ৮ দিন আগে বরাদ্দ হাতে পাই। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় টাকা তুলে বিডি (ব্যাংক ড্রাফট) করে রাখা হয়েছে।’
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ৩ মাস অতিবাহিত হলেও কাজ শেষ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূল ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন না করে স্থানীয় বিএনপি-সমর্থিত ঠিকাদার রুহুল আমীনের কাছে কাজটি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু রুহুল আমিনকে বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কাজ বন্ধ রেখেছেন।’
তবে কাজ কিনে নেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বিএনপি নেতা ও ঠিকাদার রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি কাজটি কেন কিনতে যাব, আমি নিজেই তো কাজটি পেয়েছি এবং বর্তমানে আমার কাজ চলমান রয়েছে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য গত তিন দিন ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েও ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি এবং খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
সার্বিক বিষয়ে রংপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি উন্নয়ন প্রকল্প বরাদ্দ দিয়েছি, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল ইউএনও ও উপজেলা প্রকৌশলীর। তারা কেন নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি, সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
মনোয়ারুল হক/
