তথ্যের বিকৃতি মানে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করা
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৮ নভেম্বর): সঠিক উপাত্ত ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় এবং নির্ভুল তথ্য হলো সরকারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তথ্যের হেরফের করা মানে নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রবিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে পরিসংখ্যান ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জাতীয় পরিসংখ্যান দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথাগুলো বলেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে অতীতে যে বৈরী পরিস্থিতি ছিল, দায়িত্ব গ্রহণের পর তা পুরোপুরি দূর হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে আমরা একটি গতিশীল ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারছি, যা পরিসংখ্যান ব্যুরোর সকল কর্মকর্তার আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই সম্ভব হয়েছে। আমরা যেকোনো কর্মসূচি গ্রহণের সময়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বরাবরই অর্থনীতিকে গণতন্ত্রীকরণের ওপর জোর দিয়েছি। রাজনীতির গণতন্ত্রীকরণের একটি স্তরে হয়তো পৌঁছানো সম্ভব, তবে অর্থনীতি যদি গণতন্ত্রীকরণ না হয়, তবে রাজনৈতিক গণতন্ত্র কখনোই সফল হতে পারে না।’
এই কারণে পরিসংখ্যান ব্যুরোর কার্যক্রমকে কীভাবে আরও বেশি গণতন্ত্রীকরণ করা যায়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্য সাধনে আমরা সর্বাত্মক চিন্তা-ভাবনা এবং সকলের সুচিন্তিত মতামত নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্রহণ করে যাচ্ছি। এটিকে কীভাবে আরও গণমুখী, জনবান্ধব, বিশ্বাসযোগ্য, নির্ভরযোগ্য, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছ করা যায়, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এসব তথ্যের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা টিকবে না। তবে অনাস্থা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যে পরিসংখ্যান পরিমাপযোগ্য হবে এবং যার স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো সংশয় থাকবে না, সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। সরকারের পক্ষ থেকে তথ্যের কোনো ধরনের বিকৃতি ঘটানো মানে মূলত নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করা। অর্থাৎ, এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেই নিজেকে বোকা বানায়। কারণ যেকোনো কর্মসূচিকে সফল করতে হলে সবার আগে নিখুঁত ও সঠিক তথ্য বা ডেটা হাতে থাকা আবশ্যক।
অর্থমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, ‘ডেটা হলো একটি সরকারের আর্থিক বিবরণী বা ব্যালেন্স শিটের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসেট হচ্ছে এই তথ্যভাণ্ডার। এটি যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা যায়, তবে কোনো জটিলতাই থাকবে না। তাই আমাদের এই কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতেই হবে। ডেটা ছাড়া ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যে ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন করেছি, তার মূল উদ্দেশ্য বিগত সরকারের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করা নয়। এর একমাত্র কারণ হলো, সমস্যার শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারলে তার সঠিক প্রতিকার দেওয়া অসম্ভব। আর সে কারণেই এই ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন যে, এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা মানসম্মত গবেষণা পরিচালনা করতে পারছেন। পাশাপাশি কোথায় বৈষম্য তৈরি হচ্ছে তা শনাক্ত করে তার যথাযথ সমাধানও দিতে পারছেন।
এই প্রেক্ষাপটে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, সহজলভ্যতা এবং পরিমাপযোগ্যতার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে অসংখ্য নীতিমালা বিদ্যমান থাকলেও, যখনই তা বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়, তখনই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ডেটার অভাব। তাই আমরা তথ্য বাস্তবায়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করছি। কারণ যার বা যে প্রতিষ্ঠানের হাতে নির্ভরযোগ্য ডেটা নেই, গবেষক হোন কিংবা ব্যক্তি—তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
আমরা তাই সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কার্যক্রম পরিচালনার ওপর অসম্ভব জোর দিচ্ছি। আর এটি একা সম্ভব নয়, সরকারের নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি সবাইকে মিলেই এটি বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের গবেষক ও বিআইডিএসের মহাপরিচালক মহোদয় এই কথাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, এটি হয়তো সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ বা সরকারের সম্পদ হতে পারে, কিন্তু এর প্রকৃত মালিক দেশের আপামর জনসাধারণ।
এ কারণে গবেষণার জন্য যে সেন্টারটি উদ্বোধন করা হয়েছে এবং তারা যে অনলাইন সিস্টেম চালু করেছে, সেখানে লুকোচুরির কিছু নেই। এটি সম্পূর্ণ একটি উন্মুক্ত পাতা। উন্মুক্ত তথ্য মানেই একটি খোলা পৃষ্ঠা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাষায় বলেছেন, তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে যাতে জনগণের মনে কোনো রূপ সন্দেহের অবকাশ না থাকে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সরকারের কার্যক্রমে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে জনগণ প্রশ্ন তুলবে—এমনটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। যে সরকারকে জনগণ ভালোবেসে ও বিশ্বাস করে ক্ষমতায়াসীন করেছে, সেই সরকারের ডেটা বা তথ্যের ওপর যদি সাধারণ মানুষেরই আস্থা না থাকে, তবে সেটি কোনো প্রকৃত নির্বাচিত সরকার হতে পারে না এবং তা জনগণের প্রত্যাশাও পূরণ করতে পারে না।
মনোয়ারুল হক/
