রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে প্রধানমন্ত্রীর ৫ প্রস্তাব
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৩ সেপ্টেম্বর): রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়ন, সহিংসতা বন্ধ, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ১১ নম্বর কক্ষে রোহিঙ্গা সংকটবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সহ-আয়োজক ও অন্যান্য অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা চরম বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। সংকট নিরসনে তিনি সুনির্দিষ্ট ৫টি প্রস্তাব তুলে ধরেন:
প্রথম প্রস্তাব: আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট এবং বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব: রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি মিয়ানমারের সব বেসামরিক জনগণের ওপর চলমান সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। নিজভূমিতে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়।
তৃতীয় প্রস্তাব: রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক সহায়তা বজায় রাখতে হবে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের আকাঙ্ক্ষা যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
চতুর্থ প্রস্তাব: টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গাম্বিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং অন্যান্য বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে দায়ীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পঞ্চম প্রস্তাব: মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এই অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৯৭৮ সাল ও ১৯৮০-এর দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিলেও ২০১৭ সালে নতুন করে সহিংসতা শুরু হলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। দীর্ঘস্থায়ী এই বাস্তুচ্যুতির ফলে শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে নতুন প্রজন্ম, যা পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি বড় নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবিকতার খাতিরে সীমান্ত খুলে দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ভার একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারেই এই সংকটের মূল উৎপত্তি এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বর্তমান রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হওয়ার পেছনে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের দ্বারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
মানবিক সহায়তার তহবিল হ্রাসের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) সহায়তার পরিমাণ কমানো হয়েছে, যা দিয়ে কেবল ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী চাহিদা মেটানো সম্ভব। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মানবিক সহায়তার উদারতা কখনো রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। আমরা চাই, তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক। বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, গাম্বিয়ার উপরাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ বি. এস. জ্যালো, মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপসহ বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।
মনোয়ারুল হক/
