১৮০ দিনে বিচার না হলেও নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বাতিল হবে না
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৩ সেপ্টেম্বর): নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কোনো মামলার বিচার কার্যক্রম নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ না হলে মামলাটি বাতিল বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হবে না মর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেছেন হাইকোর্ট। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে গেলেও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা রইল না বলে স্পষ্ট করেছেন আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণে জানানো হয়, বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের এই সময়সীমা কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়, বরং এটি কেবল একটি নির্দেশনামূলক বিধান। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বের মধ্যে পড়লেও, কেবল ওই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে মামলার কার্যক্রম কোনো আইনি অকার্যকারিতা বা বিরূপ পরিণতির মুখে পড়বে না।
বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের এবং বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র’ মামলার শুনানিতে এই রায় দেন। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার রুল খারিজ করে ২০২৩ সালের ৭ জুন এই রায় দেওয়া হয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে।
রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করতে ব্যর্থ হলে কোনো অবস্থাতেই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা যাবে না। আইনের ২০ এবং ৩১ক ধারায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন না হলে মামলা বাতিল বা স্থগিত হওয়ার মতো কোনো শাস্তিমূলক বা নেতিবাচক বিধান রাখা হয়নি।
আদালতে আসামিপক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন আইনজীবী এম. এইচ. রশীদ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। আলোচিত এই রায়টির মূল পাঠ লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।
মামলার পটভূমি
আদালতে প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে আসা-যাওয়ার সুবাদে আসামি পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাভেল ওই ছাত্রীকে একটি বাসায় নিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হলে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং পাঁচ মাসের গর্ভবতী অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশি তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয় এবং ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আদালত প্রধান আসামি পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে শুরু থেকেই পাভেল নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, বিচার বিলম্বিত হওয়ার অজুহাতে আসামি পাভেল ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। রিটে তিনি দাবি করেন, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে মামলার নথি গৃহীত হওয়ার পর নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি, যা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারার লঙ্ঘন। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে কারণ দর্শিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দেওয়ার যে আইনি বিধান ছিল, তাও মানা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। ওই সময় হাইকোর্ট মামলার বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন এবং পরবর্তীতে তা সময় সময় বৃদ্ধি করা হয়।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানির পর হাইকোর্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করে জানান যে, রিটকারী আসামি অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের পরবর্তী বিচারিক আদেশগুলো গোপন করেছিলেন, যা তার অসৎ উদ্দেশ্যকে প্রমাণ করে। আদালত বলেন, এই মামলার বিচারকার্য স্থগিত করার জন্য যে সমস্ত যুক্তি দেখানো হয়েছে তা আসামির কোনো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে না এবং এর মাধ্যমে আসামির পক্ষে কোনো আইনি অধিকারও তৈরি হয়নি।
সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এবং আইনের সঠিক ব্যাখ্যা বিবেচনা করে হাইকোর্ট আসামির করা রিটের বিপরীতে জারিকৃত রুলটি খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে এই বেঞ্চ থেকে পূর্বে দেওয়া মামলার স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার ও বাতিল ঘোষণা করা হয়।
মনোয়ারুল হক/
