জনস্বার্থ ও দেশের মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৩ সেপ্টেম্বর): জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে নিউইয়র্ক সফরে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের শুরুতেই প্রথম দিনে অত্যন্ত ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ১০টি ভিন্ন কর্মসূচিতে সফলভাবে অংশ নিয়েছেন তিনি। এসব বৈঠকে দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা সমুন্নত রাখাকেই প্রধান প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত আটটার দিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সফরের প্রথম দিনের কার্যক্রম তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে কীভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া যায় এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উঁচুতে তুলে ধরা যায়, সেই লক্ষ্যেই প্রতিটি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দিনের ব্যস্ত সূচিটি মূলত ব্যক্তিগত যোগাযোগ, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে বৈঠক—এই কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত ছিল। দিনটি শুরু হয়েছিল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আমন্ত্রণে। মহাসচিবের আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের সহধর্মিণীদের বিশেষ প্রাতঃরাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান সশরীরে অংশ নেন। প্রাতঃরাশ পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন।
উপদেষ্টা জানান, সফরের প্রথম দিনেই বেশ কয়েকজন বিদেশি নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের সুদীর্ঘ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং বহুপক্ষীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর দেশ সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মাহদী আমিন আরও জানান, এ দিন হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিস-আইমের সঙ্গেও সাইডলাইন বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে হাইতির বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সেখানে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও সাফল্য কাজে লাগানোর সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলমান রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে তিনি জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশ মিয়ানমারে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, আগামী বুধবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে একটি উচ্চপর্যায় সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে আয়োজন করছে। ওই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারসমূহ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, রেগুলেটরি সংস্কার এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের গ্রহণ করা বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা জানান, নির্ধারিত কার্যতালিকার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক এবং মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাৎ কিছু অনিবার্য কারণে সম্ভব হয়নি। তবে মেটার সঙ্গে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ফলপ্রসূ বৈঠক সম্পন্ন করেছে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশে মেটা প্ল্যাটফর্মের বিশাল ব্যবহারকারী সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এছাড়াও প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিকতার শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে আয়োজিত বিশেষ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এই অভ্যর্থনায় তাঁর যোগদানের বিষয়টি নির্ধারিত ছিল।
সবশেষে জানানো হয়, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে সরকারের নীতি ও অবস্থান তুলে ধরে নিজের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করবেন প্রধানমন্ত্রী।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান প্রমুখ।
মনোয়ারুল হক/
