বিশ্ব বাজারে দাম কমলেও দেশে তেলের দাম বাড়তি

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২২ সেপ্টেম্বর): বিশ্ববাজারে যখন জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রবণতা বা স্থিতিশীলতার কথা শোনা যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের বাজারে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ২০ টাকা বৃদ্ধি করেছে সরকার। গত রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মূল্যবৃদ্ধির কথা জানানো হয়, যা ওই দিন রাত ১২টার পর থেকেই কার্যকর হয়েছে।

হঠাৎ করে এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিপুল আর্থিক লোকসান এড়ানো। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক এবং এর নেপথ্য কারণগুলো কী?

নতুন মূল্যতালিকা: এক নজরে দাম বৃদ্ধি

মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে এভাবে:

জ্বালানি তেলের নাম আগের দাম (প্রতি লিটার) নতুন দাম (প্রতি লিটার) বৃদ্ধি
ডিজেল ১১৫ টাকা ১৩৫ টাকা ২০ টাকা
কেরোসিন ১৩৫ টাকা ১৫৫ টাকা ২০ টাকা
পেট্রোল ১৪০ টাকা ১৬০ টাকা ২০ টাকা
অকটেন ১৪৫ টাকা ১৬৫ টাকা ২০ টাকা

মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ: বিপিসির বিশাল লোকসান

মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ মাস থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য এবং ফ্রেইট চার্জ বা পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে এতদিন সরকার দেশে দাম বাড়ায়নি।

ফলস্বরূপ, গত মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত এই কয়েক মাসেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বিবেচনায় কেবল ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এতে দৈনিক লোকসান দাঁড়াচ্ছিল প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু ডিজেল খাতেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতো, যা রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করত।

পার্শ্ববর্তী ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র

সরকার তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দামের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান বাজারে বিভিন্ন দেশে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে নিম্নরূপ:

  • ভারত (কলকাতা): ১৩৪.৭৬ টাকা
  • মিয়ানমার: ১৬৪.৮৩ টাকা
  • নেপাল: ১৬১.২৪ টাকা
  • শ্রীলঙ্কা: ১৭৯.৪২ টাকা
  • থাইল্যান্ড: ১৫১.২২ টাকা
  • ভিয়েতনাম: ১৩৭ টাকা
  • মালদ্বীপ: ১৪০.৭১ টাকা
  • ফিলিপাইন: ১৬৮.৫৩ টাকা
  • পাকিস্তান: ১৮৫.৪৮ টাকা
  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: ১৪৪.৭৯ টাকা

সরকারের দাবি, আঞ্চলিক বাজারগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ডিজেলের দাম এখনো সহনশীল সীমার মধ্যেই রাখা হয়েছে।

জনজীবনে সম্ভাব্য প্রভাব

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কাঁচাবাজার এবং কৃষিকাজে (সেচ পাম্প ও ট্রাক্টর পরিচালনায়)। ফলে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ