রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা বিলে ট্রাম্পের সই, ১০০% শুল্কের ঝুঁকিতে ভারত-চীন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৯ সেপ্টেম্বর): যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক একটি বিলে অনুমোদন দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মস্কোর জ্বালানি পণ্য ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক চাপানোর নজিরবিহীন ক্ষমতা পেল হোয়াইট হাউস।
এই পদক্ষেপের কারণে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশ ভারত ও চীনের মতো রাষ্ট্রগুলোর ওপরও শাস্তিমূলক শুল্কের খাঁড়া ঝুলছে বলে জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এতে ভারত ও চীনের ওপরও শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানায় ইন্ডিয়া টুডে।
নতুন পাস হওয়া এই আইনে বলা হয়েছে, রাশিয়ান ক্রুড অয়েল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান পাঁচ ক্রেতাদেশের পণ্যের ওপর ৩০ দিনের ভেতরই সর্বোচ্চ একশ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে বাধ্য থাকবেন ট্রাম্প। এই আইন কার্যকর হওয়ার পর যদি কোনো দেশ জেনেশুনে নতুন করে রুশ জ্বালানি কেনে, তবে তাদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে। এমনকি মস্কোকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে এমন শীর্ষ পাঁচটি দেশের ওপরও এই নিয়ম সমানভাবে বর্তাবে।
রুশ জ্বালানির সবচেয়ে বড় ক্রেতা তালিকায় ভারত ও চীন থাকলেও, এই বিলে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি। কোন দেশগুলোকে এই তালিকার আওতাভুক্ত করা হবে, তারও কোনো স্পষ্ট মাপকাঠি রাখা হয়নি। ফলে কাদের ওপর এই বাড়তি শুল্কের খড়্গ নামবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন পেয়ে গেছে অবাধ নিয়ন্ত্রণ।
এর প্রভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশকারী ভারতীয় পণ্যের ওপর বড় অংকের শুল্ক বসানোর পথ উন্মুক্ত হতে পারে। তবে এর তাৎক্ষণিক ফল কী দাঁড়াবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্কিন ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দাম ও জ্বালানি খরচ হঠাৎ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়তো স্বচ্ছন্দ বোধ করবেন না ট্রাম্প। বিশেষ করে আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন হতে পারে। কংগ্রেসে পাস হওয়া এই বিলের মূল লক্ষ্যই হলো রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতকে চাপে রাখা।
নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে মস্কোকে সহযোগিতা করছে—এমন সন্দেহভাজন তেলবাহী ট্যাংকার বহরকেও এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যাকে ‘ছায়া বহর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে যেকোনো সময় শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এখতিয়ারও নিজের হাতে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত বছরের জুলাইয়ে দীর্ঘ এক বছর ঝুলিয়ে রাখার পর ট্রাম্প এই বিলটি এগিয়ে নেওয়ার সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের ভেতরের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আসন্ন বৈঠকের আগে মার্কিন প্রশাসনকে বাড়তি দরকষাকষির সুবিধা দিতেই আইনটি দ্রুত পাস করাতে জোরালো চাপ ছিল।
হোয়াইট হাউসের আইন বিষয়ক পরিচালক জেমস ব্রেইড জানান, গত প্রায় চার দশকের মধ্যে এই প্রথম কংগ্রেস দেশটির নির্বাহী বিভাগকে সরাসরি শুল্ক আরোপের এমন নতুন ক্ষমতা দিল। তবে ঠিক কোন কোন দেশ শেষ পর্যন্ত এই শুল্কের মুখে পড়বে তা ধোঁয়াশাপূর্ণ থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ন্যাশনাল ফরেন ট্রেড কাউন্সিলের সহ-সভাপতি জেনেট চু মনে করেন, কোন কোন রাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে পারে, তা নিয়ে নানা রকম হিসাব-নিকাশ চলছে। এই আলোচনার তালিকায় ভারত ছাড়াও ব্রাজিল, জাপান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের নাম উঠে আসছে। নতুন এই মার্কিন শুল্কের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে বেইজিং আন্তর্জাতিক আইনে যার কোনো ভিত্তি নেই এমন ‘দূরপ্রসারী এখতিয়ার’ প্রয়োগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, আইনের ভাষা বড্ড বেশি বিস্তৃত এবং এতে প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী লরা ব্র্যাঙ্কের শঙ্কা, এই ব্যাপক ক্ষমতার অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
অবশ্য রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের যুক্তি, কোন দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তা নির্ধারণের যথেষ্ট মানদণ্ড এই বিলে রয়েছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে অন্য কোনো সম্পর্কহীন পণ্যের ওপর শুল্ক চাপানোর কোনো গোপন সুযোগ রাখা হয়নি। তবে শুল্ক কার্যকরের এই ৩০ দিনের সময়সীমা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বা কাছাকাছি সময়ে এই শুল্কের ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রুশ জ্বালানি আমদানিকারকদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসালে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ওপরও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে পুনরায় হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ট্রাম্প ইতোমধ্যে ৮০টিরও বেশি দেশের পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিলেন। যদিও এর অনেকগুলো পদক্ষেপই পরে সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হয়ে যায়; কারণ হিসেবে আদালত জানায়, ট্রাম্প তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন। তবে এবারের নতুন আইনের ক্ষেত্রে আইনি লড়াই বেশ কঠিন হবে, কারণ কংগ্রেস স্পষ্টভাবে শুল্ক আরোপের এই অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে যেকোনো সময় ছাড় দেওয়ার চাবিকাঠিও প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকছে।
ট্রেজারি বিভাগের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বেন হ্যারিস মন্তব্য করেছেন, ‘আইনে ব্যবহৃত সংজ্ঞাগুলো বেশ অস্পষ্ট, আর এই ছাড় দেওয়ার ক্ষমতার আড়ালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায় এড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রাখা হয়েছে।’
মনোয়ারুল হক/
