তৃণমূলের প্রতীক জোড়াফুল হাতছাড়া হলো মমতার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৮ সেপ্টেম্বর): ১৯৯৮ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ও অভূতপূর্ব মোড় তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায় এই প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনে জোড়া ঘাসফুল প্রতীক ছাড়াই লড়াই করতে হচ্ছে দলটিকে। আগামী ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম বিধানসভার উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।

এর ফলে আপাতত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকছে না সেই পরিচিত জোড়া ঘাসফুল প্রতীক— যে প্রতীকটি ২৮ বছর আগে তিনি নিজেই এঁকেছিলেন বলে দাবি করা হয়।

আসন্ন উপনির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীক নিজেদের বরাদ্দের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী নেতা’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুসারী ও সমর্থকরা। মূলত সেই আবেদনের প্রেক্ষিতেই গত বৃহস্পতিবার রাতে রেজিনগর ও নন্দীগ্রাম আসনে জোড়া ঘাসফুল প্রতীক ব্যবহারের ওপর স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত জানায় কমিশন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের প্রকৃত নেতৃত্ব কে, আসল তৃণমূল কংগ্রেস কোনটি এবং দলীয় তহবিলের মালিকানা কার হাতে থাকবে— এসব আইনি ও সাংগঠনিক প্রশ্নের সুরাহা হলেই কেবল প্রতীকের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যজুড়ে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর এই দুই কেন্দ্রে বিধানসভার উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ইতোমধ্যে সব রাজনৈতিক দলই তাদের নিজ নিজ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে। এদিকে তৃণমূলের মমতাপন্থি এবং বিদ্রোহী— উভয় পক্ষ থেকেই আলাদাভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জটিল পরিস্থিতির কারণে দুই শিবিরের প্রার্থীরাই এখনও নিশ্চিত নন যে তারা ঠিক কোন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামবেন।

উল্লেখ্য, গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরই মূলত জোড়াফুল শিবিরের অন্দরে বড় ধরনের ভাঙন ধরে। ওই নির্বাচনে রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল প্রার্থীরা মোট ৮০টিতে জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু ফলাফল প্রকাশের রেশ কাটতে না কাটতেই দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ও বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলে বড়সড় বিদ্রোহ দেখা দেয়। জানা যায়, সে সময় নির্বাচিত ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৫৮ জনই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেন। বর্তমানে বিদ্রোহী বিধায়কদের এই শক্তিশালী সমর্থন নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন।

সেই থেকেই মূলত মমতা অনুসারী ও ঋতব্রতপন্থি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষই নিজেদের মূল ও ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করে আসছে।

গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, আপাতত কোনো পক্ষকেই ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ এই নামটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুই শিবিরকেই তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য আলাদা নতুন নাম বেছে নিতে হবে। তবে চাইলে সেই নতুন নামের সঙ্গে মূল দলের সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ রাখা যেতে পারে।

কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, কালীঘাট বা ঋতব্রতের অনুসারী— কোনো পক্ষই জোড়াফুল প্রতীকটি ব্যবহার করতে পারবে না। আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য উভয় পক্ষকেই নির্বাচন কমিশনের সংরক্ষিত প্রতীক তালিকা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি প্রতীক বেছে নিতে হবে।

তবে নির্বাচন কমিশন এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তৃণমূলের দলীয় নিয়ন্ত্রণ কিংবা জোড়াফুল প্রতীক সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তটি একেবারেই অন্তর্বর্তীকালীন এবং এটি কোনো চূড়ান্ত রায় নয়। সার্বিক পরিস্থিতি ও সব পক্ষের আইনি দিক বিবেচনা করে এই বিষয়ে পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। নতুন এই রাজনৈতিক দলটির স্বতন্ত্র ও অনন্য পরিচিতি গড়ে তুলতে তিনি নিজ হাতে একটি অর্থবহ প্রতীকের স্কেচ তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন লাভ করে।

ওই প্রতীকে সবুজ ঘাস ভেদ করে দুটি ফুটন্ত ফুলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ‘তৃণমূল’ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রান্তিক মানুষ ও সাধারণের অধিকার রক্ষা এবং মাটির কাছাকাছি থেকে রাজনীতি করার বার্তা দিতেই ঘাসফুলের এই বিশেষ ধারণাকে বেছে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই গত প্রায় তিন দশক ধরে এই ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিভিন্ন আন্দোলন এবং তাঁর জনপ্রিয় রাজনৈতিক স্লোগান ‘মা-মাটি-মানুষ’-এর সমার্থক হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। সাধারণ ভোটারদের কাছে দলীয় পরিচিতি ও জনভিত্তি তৈরিতে এই সহজ ও পরিচিত প্রতীকটি সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। সূত্র: আনন্দবাজার

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ