দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশব্যাপী গড়ে উঠছে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৭ জুন) : দেশের অর্থনীতিতে সৃজনশীলতার ছোঁয়া লাগাতে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে দেশব্যাপী গড়ে তোলা হচ্ছে অত্যাধুনিক ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা সৃজনশীল কেন্দ্র।

একই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ (ওয়ান-ভিলেজ, ওয়ান-প্রোডাক্ট) উদ্যোগের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রসারের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এই যুগান্তকারী উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক বাস্তবায়নে বাজেট থেকে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের আশা করছে সরকার।

জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন- “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো দেশের সৃজনশীল শিল্পখাতের সুপ্ত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা এবং একে মূলধারার অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা। আমরা বিশ্বাস করি, এই সম্ভাবনাময় খাতটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, গ্লোবাল ব্র্যান্ডিং এবং ভবিষ্যতের কল্যাণমুখী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক অনন্য মাইলফলক হবে।”

‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও বৈচিত্র্যময় কারুশিল্পকে বিশেষভাবে ব্র্যান্ডিং করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে- তাঁত ও বয়ন শিল্প এবং শতরঞ্জি। মৃৎশিল্প, টেরাকোটা ও শীতল পাটি। ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুল, হাতে তৈরি গহনা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক বিশেষ পণ্য।

এসব পণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে একটি ‘ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনার্স’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) বর্তমান ডিজাইন সেন্টারকে আন্তর্জাতিক মানের আদলে আধুনিকায়ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ক্রিয়েটিভ হাবগুলো কেবল বাণিজ্যিক কেন্দ্রই হবে না, বরং এক একটি সাংস্কৃতিক মিলনমেলা হিসেবে কাজ করবে। প্রতিটি হাবে থাকবে- আধুনিক সাংস্কৃতিক ভেন্যু ও সিনেপ্লেক্স, পাঠ সুবিধাসহ সমৃদ্ধ বইয়ের দোকান, আকর্ষণীয় ক্যাফেটেরিয়া, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচির আওতাধীন আঞ্চলিক পণ্যের প্রদর্শনী ও বিপণন কেন্দ্র।

সৃজনশীল অর্থনীতির এই ধারাকে টেকসই করতে একটি ১০ বছর মেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু কৌশলগত স্থানে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে ঢাকার পূর্বাচলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি বিশ্বমানের ‘কেন্দ্রীয় ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজগাঁওয়ে সার্ভেয়ার জেনারেলের কার্যালয়ের পাশের অব্যবহৃত জমি এবং বিসিকের খালি প্লটগুলোতেও এই হাব করার পরিকল্পনা চলছে।

শুধু ঢাকাতেই নয়, এই উদ্যোগকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বিভাগীয় শহর, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও ক্রিয়েটিভ হাব স্থাপনের কাজ পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হবে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এবং শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণেও একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট নথিতে বলা হয়েছে, দেশে একটি প্রাণবন্ত সৃজনশীল অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে এবং সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সৃষ্টিতে ক্রিয়েটিভ হাবের উন্নয়নকে অপরিহার্য মনে করে সরকার।

ক্রিয়েটিভ হাব কর্মসূচির পাশাপাশি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতোমধ্যে ইনোভেশন হাব (উদ্ভাবন কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশব্যাপী অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোতে এই সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য একটি রোডম্যাপও তৈরি করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য সৃজনশীল অর্থনীতির পণ্যের উৎপাদন, প্রচার ও বিপণন জোরদার করার পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে অর্থনৈতিক সুযোগের গণতান্ত্রিকীকরণ করতে চায়।

তিনি বলেন, ‘আমরা সমাজে অর্থনৈতিক সুযোগের গণতন্ত্রীকরণ করতে চাই, যাতে জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘায়ুজনিত লভ্যাংশকে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশে রূপান্তর করা যায়।’

দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপকল্পের কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার লক্ষ্য আমাদের।

সরকার আশা করছে, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ কর্মসূচি, ক্রিয়েটিভ হাব, ইনোভেশন হাব এবং ডিজাইন সহায়তা উদ্যোগের সমন্বিত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের অবদান বাড়বে।

একই সঙ্গে এই খাতের মাধ্যমে ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জিডিপিতে এর অবদান ১.৫ শতাংশে উন্নীত হবে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ