ইরান পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ‘মাস্টারপ্ল্যান’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (১৬ জুন) : ইরানের সাথে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সংঘাতের স্থায়ী ইতি টানতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। তেহরানের সাথে একটি চূড়ান্ত ও পরমাণু চুক্তি-সংবলিত সমঝোতা সফল হলে, দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ তহবিল অনুমোদনের গ্রিন সিগন্যাল দিতে প্রস্তুত বাইডেন প্রশাসন। একই সাথে পর্যায়ক্রমে দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিকেও টেবিলে রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল এবং দেশটির ভাঙাচোরা অবকাঠামো মেরামতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি মহাপ্রকল্পের খসড়া নিয়ে আলোচনা করছে।

তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই বিশাল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি নির্ভর করবে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের (MoU) শর্তাবলি ইরান কতটা নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করতে পারছে, তার ওপর।

সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার এই সমঝোতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, গত রোববারই ‘ইলেকট্রনিক্যালি’ এই চুক্তি হয়ে গেছে। এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি হয়ে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে।

আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, তহবিলটি কার্যকর হবে তখনই, যখন সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক নিষ্পত্তি অর্জিত হবে। এর আগে যুদ্ধবিরতি আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা সম্পন্ন করতে হবে। তিনি জানান, এই অর্থ কোনো সরকারের কোষাগার থেকে আসবে না। বরং ইরানে বিনিয়োগে আগ্রহী আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বিনিয়োগ কাঠামো হিসেবে এটি গড়ে তোলা হবে।

৯ কোটি মানুষের জ্বালানিসম্পদসমৃদ্ধ দেশ ইরানকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আলোচনা সম্পর্কে অবগত ওই ব্যক্তি বলেন, ইউরোপের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের কোম্পানির আগ্রহ রয়েছে। মার্কিন কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকেও আগ্রহ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে এই তহবিলের আকার অত্যন্ত বড় হবে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এমন একটি সুযোগ, যার সুবিধা ইরান পেতে পারে, যদি তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করে।’

তবে এই আর্থিক প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও বিতর্ক তৈরি করেছে। আলোচনায় সংশ্লিষ্টদের মতে, ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে এমন অবস্থানে যেতে চান না যেখানে তাঁকে ইসলামিক শাসনব্যবস্থাকে পুরস্কৃত করার অভিযোগের মুখে পড়তে হয়। এর আগে তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল, ওই চুক্তির মাধ্যমে তেহরানকে ‘নগদ অর্থের প্যালেট’ পাঠানো হয়েছিল।

বর্তমান সমঝোতার সমালোচকদের দাবি, আলোচনায় থাকা আর্থিক সুবিধাগুলোর পরিমাণ ওবামা আমলের চুক্তির তুলনায় অনেক বড়। গতকাল সোমবার এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প, জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দূরবর্তীভাবে নথিতে স্বাক্ষর করলেও এখন পর্যন্ত ইরানে এক ডলারও প্রবাহিত হয়নি। আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তি বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল কিংবা বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে হবে। এগুলো নির্ভর করবে পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত সমঝোতার বাস্তবায়নের ওপর।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, আস্থা তৈরির উদ্দেশ্যে শুরুতে সীমিত কিছু আর্থিক ছাড় দেওয়া হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন নির্দিষ্ট সূচকের ভিত্তিতে নয়, বরং সামগ্রিক আচরণ মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করতে পারে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। বরং বিষয়টি ইরানের সামগ্রিক আচরণ এবং বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবে তেহরান ও ওয়াশিংটন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিষ্পত্তির একটি পদ্ধতি নিয়েও একমত হয়েছে। আলোচনায় অবগত ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম শর্ত হলো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সব ইউরেনিয়াম ইরানের ভেতরেই পাতলা বা ডাইলিউট করা হবে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন, ইসরায়েলের সঙ্গে গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ওই কর্মসূচিকে কার্যত পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করেছে। তবে ওয়াশিংটনের লক্ষ্য এখন এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে ইরান ভবিষ্যতে সেই সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে না পারে।

বর্তমানে ইরানের কাছে ৯ হাজার কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এর বেশিরভাগ নিম্নমাত্রার হলেও প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম অস্ত্রমানের কাছাকাছি মাত্রায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এই অংশকে ট্রাম্প ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ