কম্বোডিয়ার ‘সাইবার দাসত্ব’ থেকে মুক্ত ৩৭ বাংলাদেশি, দেশে প্রত্যাবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১২ জুন) : উচ্চ বেতনের রঙিন স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিয়ে কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম বা প্রতারণা চক্রের নরককুণ্ডে ফেঁসে গিয়েছিলেন একদল বাংলাদেশি। অবশেষে সেখান থেকে উদ্ধার পেয়ে দেশে ফিরেছেন ৩৭ জন নাগরিক।

শুক্রবার (১১ জুন) রাত ১টা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজের (টিজি-৩৩৯) একটি ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।

বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বেসরকারি সংস্থা ‘ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম’-এর পক্ষ থেকে ভুক্তভোগীদের জরুরি সহায়তাসহ নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়।

ফেরত আসাদের মধ্যে শাহিনুর রহমান (ছদ্মনাম) নামের একজন তাঁর লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, বৈধ পথেই ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পা রাখামাত্রই স্থানীয় কিছু বাংলাদেশি দালালের সহায়তায় তাঁদের মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চীনা অপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা গোপন ডেরায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।

সেখানে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিভিন্ন অনলাইন জালিয়াতির কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের ফাঁদে ফেলার লক্ষ্য দেওয়া হতো আমাদের। আর সেই লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলেই নেমে আসতো অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।”

সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে এই চক্রের কবল থেকে এই ৩৭ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে ব্র্যাক।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার থেকে ৮ জন এবং এর আগে ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আরও ১৮ জন বাংলাদেশিকে একইভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল। থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা ‘মায়েসট’ হয়ে তাঁদের প্রতারণার মাধ্যমে মিয়ানমারে পাচার করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রথমেই তাঁদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতো এবং চলতো ভয়াবহ নির্যাতন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই বিষয়টিকে মানবপাচারের এক নতুন ও ভয়াবহ রূপ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কম্পিউটার অপারেটর, টাইপিস্ট কিংবা কল সেন্টার জবের নামে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। ফাঁদে পা দিলেই সুকৌশলে জিম্মি করে অস্ত্রের মুখে সাইবার অপরাধ করতে বাধ্য করা হয়। ইতিমধ্যেই সরকার ও ব্র্যাকের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

শরিফুল হাসান আরও যোগ করেন, এই দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর আগে সরকারের উচিত চাকরির সত্যতা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে এবং এই আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম চক্রের নেটওয়ার্ক ভাঙতে এখন বিশ্বজুড়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ