ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ভয়ংকর শাসনের দিকে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৬ এপ্রিল) : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানে ক্ষমতার কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর দেশটিতে পতন নয়, বরং আরও কঠোর ও কেন্দ্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হতে পারে নতুন একধরনের ‘সামরিক ইসলামিক রাষ্ট্র’, যা আগের চেয়েও বেশি দমনমূলক ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ।

দ্য হিল-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে ইরানের ইসলামিক শাসনব্যবস্থার ভেতরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাইরে থেকে এটি দুর্বল মনে হলেও ভেতরে ক্ষমতা আরও শক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এটি একধরনের নতুন শিয়া সামরিক শাসন, যাকে ‘তৃতীয় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ বলা যায়।

একদিকে নতুন এই ইরানের প্রচলিত ও পারমাণবিক সক্ষমতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই বাহিনী এখন আগের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী এবং দমন-পীড়ন বাড়াতে পারে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধের মতো কৌশল ব্যবহার করে তারা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সাধারণভাবে ইরানে শিয়া ধর্মীয় নেতারা (মোল্লারা) দৃশ্যমান ক্ষমতায় থাকলেও বাস্তবে কার্যকর ক্ষমতা ধীরে ধীরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে চলে গেছে–যেমন আইআরজিসি, গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক। যুদ্ধ এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে।

বৈশ্বিক চাপের মুখে সরকার সংস্কার বা আলোচনার দিকে না গিয়ে ইরান আরও সামরিকমুখী হয়েছে। শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা তাদের দুর্বল করেছে। তবে এতে উগ্রপন্থি নেতৃত্বের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

সদর দপ্তর ও লজিস্টিক সরবরাহ নেটওয়ার্কে হামলার ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে পরিচালনার ক্ষমতা কমেছে। তবে এই ব্যবস্থায় আগে থেকেই বিকল্প কাঠামো রাখা ছিল। আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে একাধিক সমান্তরাল কমান্ড ব্যবস্থা রয়েছে, যা পুরো ব্যবস্থার ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করছে। এতে সিদ্ধান্ত নিতে সময় বেশি লাগছে, কিন্তু কাঠামো টিকে আছে।

এদিকে অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর শাসনব্যবস্থা এখন কেবল দমন-পীড়ন আর সংকট মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ। যোগ্যতার বদলে অনুগতদের বড় পদে বসানো হচ্ছে। এতে রাষ্ট্রের দক্ষতা কমছে, কিন্তু কঠোরতা বাড়ছে। অযোগ্যতা ঢাকতে জনগণের ওপর বেশি দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে।

তেহরানের এই পরিবর্তনের মাঝেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ভাষণে তার এই অভিযানকে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংস করার একটি চূড়ান্ত প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের জন্য যাতে আর হুমকি হতে না পারে, সে জন্য ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত থাকবে। কোনো সমঝোতা না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং খার্গ দ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনে তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।” ট্রাম্পের এই কঠোর ভাষা তার সমর্থকদের উৎসাহিত করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করায় আঞ্চলিক সংঘাত এখন বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটে পরিণত হয়েছে। তেহরানকে এই জলপথ পুনরায় খুলতে বাধ্য না করেই যদি ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধ করে, তাহলে ইরান তার লক্ষ্যই অর্জন করবে। অর্থাৎ একটি যুদ্ধবিরতি, যার মাধ্যমে তারা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হাতে রেখে দেবে এবং ভবিষ্যতে আমেরিকার জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে থাকবে।

অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরালে প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে যাবে। তবে বিশ্লেষকরা এটিকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না। এ কারণে তিনি ন্যাটো মিত্রদের ওপর চাপ দিয়ে বলেছেন, ‘ইরানে কঠিন কাজটুকু শেষ হওয়ায় এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত হরমুজ প্রণালির দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’

যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় ইরানের একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: যুদ্ধ বা শান্তির সিদ্ধান্ত আসলে কে নেয়? ট্রাম্প দাবি করেছেন, ‘নতুন, কম উগ্র ও বেশি বুদ্ধিমান’ একজন ইরানি প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে তিনি সাফ জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা হবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের প্রেসিডেন্টের হাতে সামরিক কোনো ক্ষমতা নেই। আসল ক্ষমতা রেভল্যুশনারি গার্ড, আইআরজিসি ও আহমদ ওয়াহিদির মতো নেতাদের হাতে। এটি এমন এক ব্যবস্থা, যা সংবিধানের চেয়ে ব্যক্তি ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

এই কারণে তেহরানের কাছে যুদ্ধবিরতি মানে পশ্চিমা বিশ্বের মতো নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি শুধু চাপ সামলানোর কৌশল। এখানে বিরতি মানে স্থায়ী শান্তি নয়, বরং সহিংসতার ধারাবাহিক চক্রের একটি অংশ।

ইরানের যেসব মানুষ এই ব্যবস্থার সংস্কার নয়, বরং পুরোপুরি ‘শাসন পরিবর্তন’ চান, তাদের জন্য পরিস্থিতি খুবই কঠিন। এর পরিণতি হলো অর্থনৈতিক ধস ও আরও বেশি দমন-পীড়ন। তবে দেশটির সরকারের কাছে জনকল্যাণের চেয়ে টিকে থাকাই এখন বড় লক্ষ্য। শাসকরা ভালো করেই জানেন, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না; কিন্তু এই সত্যটি মেনে নিয়ে তারা নিজেদের বদলানোর বদলে বরং সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’

অদ্ভুত শোনালেও সত্যটা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তেহরানের ক্ষমতা বা দাপট কমে যাবে; বরং উল্টো তাদের প্রভাব আরও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ইরান একটি দুর্বল কিন্তু আরও উগ্র ও স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। এটি আগের ব্যবস্থার চেয়েও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওয়াশিংটন জিতল কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো তারা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তাদের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত ইরানকে এমনভাবে চাপে রাখা যেন তারা জ্বালানি সরবরাহ পথকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে এবং রাজনীতিকে সামরিকীকরণ করতে না পারে। অন্যথায় দেশটি কেবল একটি সামরিক জান্তা বা উগ্র শাসকের হাতেই বন্দি থেকে যাবে।’ সূত্র: দ্য হিল

লেখক: এরফান ফার্দ সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশ্লেষক এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ