ইরানে হামলার জন্য ভয়াবহ সব অস্ত্র জড়ো করছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৬ এপ্রিল) : গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে ইরানকে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে তাদের সবচেয়ে ভয়ানক কিছু দূরপাল্লার অস্ত্র মোতায়েন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশ্বের অন্যান্য কৌশলগত অবস্থানে মোতায়েন করা জেএএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে আসা হয়েছে, যা ইরানে পরবর্তী হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে। মূলত, জেএএসএসএম-ইআর বা জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস মিসাইল-এক্সটেন্ডেড রেঞ্জ ৯৬৫ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, যা শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়ানোর জন্য এটিকে দূরবর্তী স্থান থেকে আঘাত হানার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।
ব্লুমবার্গের রিপোর্টে আরও বলা হয়, প্রায় ১৫ লাখ ডলার মূল্যের এসব মিসাইল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মজুত থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ মার্চের শেষ দিকে দেওয়া হয়। মার্কিন ভূখণ্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে মিসাইলগুলো সরিয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এবং যুক্তরাজ্যের ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইরানসংক্রান্ত অভিযানের জন্য ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এ ছাড়া দূরপাল্লার সংস্করণের পাশাপাশি প্রায় ২৫০ মাইল (৪০২ কিমি) পাল্লার (স্বল্প পাল্লার) জ্যাসম ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশও ইরানের যুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সদস্যদের ঝুঁকি কমাতে জেএএসএসএম-ইআরের মতো স্ট্যান্ডঅব অস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে। তবে এই কৌশলের ফলে ভবিষ্যতে চীনের মতো আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য রাখা মজুত কমে যাচ্ছে। এর আগে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্সের কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধ চালাতে গিয়ে দূরপাল্লার অস্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দেওয়া এক হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানজুড়ে ১২ হাজার ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির কারখানাও রয়েছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার সপ্তাহে মার্কিন অভিযান ১ হাজারটিরও বেশি জেএএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে। পুনরায় মোতায়েনের পর যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রায় ২ হাজার ৩০০ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থেকে বিশ্বব্যাপী মাত্র ৪২৫টি অবশিষ্ট থাকবে। তবে আমেরিকার জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ হলো, ক্ষতি বা কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৭৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ‘অকার্যকর’ বা ব্যবহার করা যাবে না। বর্তমান যে হারে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন হচ্ছে, তাতে ব্যবস্থার মজুত পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগবে। যদিও এত ব্যবস্থার পরেও ইরানের আকাশসীমায় এই সপ্তাহে একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান এবং একটি এ-১০ আক্রমণকারী বিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। এরপর ইরান আবার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে নিয়োজিত দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারেও হামলা চালায়। এতে ট্রাম্পের আকাশ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে নস্যাৎ করেছে। যদিও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান এক ডজনেরও বেশি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে বিমান হারানোর পর যুক্তরাষ্ট্র চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বেশির ভাগই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে আমেরিকার এই ক্ষয়ক্ষতি এটিই প্রমাণ করে যে তেহরান এখনো কিছু কৌশল হাতে রেখেছে। এটি এখনো মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় হুমকি। তাই ওয়াশিংটন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে আরও জোরদার করছে।
যদিও বিপুলসংখ্যক জেএএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার অর্থ এই নয় যে সব কটিই ব্যবহার করা হবে। ইতোমধ্যেই বি-৫২ ও বি-১বি বিমান ও যুদ্ধবিমান থেকে এই মিসাইল ছোড়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, এই অভিযানটি দীর্ঘদিন চলবে। তাই বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করতে চলেছে।
মনোয়ারুল হক/
