গাজা অভিমুখী কয়েকশ’ অধিকারকর্মীকে মুক্তি দিল ইসরায়েল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২২ মে) : গাজা উপত্যকার দিকে রওনা হওয়া একটি ত্রাণবাহী নৌবহরে অভিযান চালিয়ে কয়েক শত আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীকে আটক করেছিল ইসরায়েল। তবে বিশ্বব্যাপী তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার মুখে অবশেষে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়েছে তেল আবিব।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার (২১ মে) এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়ার সময় নৌবহরটিতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। সেখান থেকে বিপুল সংখ্যক অধিকারকর্মীকে হেফাজতে নেওয়ার পর তাদের ওপর অমানবিক আচরণ ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে। ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে পড়ার পর, আটককৃতদের ছেড়ে দেওয়ার ও ফেরত পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল প্রশাসন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কে বৃহস্পতিবার দিনভর নৌবহরের বহু অংশগ্রহণকারী ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। তাদের কেউ কেউ ফিলিস্তিনি কেফিয়াহ গলায় জড়িয়ে শান্তির প্রতীক হিসেবে আঙুল তুলে ধরেন। ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে সমর্থকেরা তাদের স্বাগত জানান।
আঙ্কারা একটি বিশেষ ফ্লাইটে মোট ৪২২ জনকে সরিয়ে নিয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ জন তুরস্কের নাগরিক রয়েছেন। বর্তমানে তাদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক দল ও অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন করা হয়েছে।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই দলে ৩৭ জন ফরাসি নাগরিক ছিলেন। কয়েকজন স্প্যানিশ অধিকারকর্মী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তুরস্ক হয়ে মাদ্রিদে পৌঁছান। অন্যদিকে, জর্ডান জানিয়েছে, তাদের দুই নাগরিক ইসরায়েলের সঙ্গে দক্ষিণ সীমান্তপথ দিয়ে দেশে ফিরেছেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন আগে বলেছিলেন, প্রচারমূলক এই নৌবহরের সব বিদেশি কর্মীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গাজার ওপর বৈধ নৌ অবরোধ ভঙ্গের কোনো সুযোগ ইসরায়েল দেবে না।
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের অধিকারবিষয়ক আইনি সংস্থা আদালাহ আল জাজিরাকে জানিয়েছে, প্রায় ৪৩০ জন আটক অধিকারকর্মীর বেশিরভাগকে দক্ষিণ ইসরায়েলের রামোন বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাকিদের তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর দিয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রথমবারের মতো নৌযাত্রায় অংশ নেওয়া ৫৭ বছর বয়সী বেলজিয়ান নাগরিক জুলিয়েন কাবরাল ইস্তাম্বুলে পৌঁছানোর পর তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। তার চোখের নিচে কালশিটে দাগ ও বাঁ কপালে ক্ষত রয়েছে। তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, সাতজনের নৌকায় হামলা চালানোর সময় এক ইসরায়েলি নৌসেনা সদস্য তাকে ঘুষি মারে।
তিনি অভিযোগ করেন, আটক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে অধিকারকর্মীদের চড় মারা হয়েছে, গালাগালি করা হয়েছে এবং খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী পাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসকের কাছেও যেতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
অধিকারকর্মীদের সঙ্গে আটক হওয়া এবং অন্যদের আগে ফেরত পাঠানো ইতালীয় সাংবাদিক আলেসান্দ্রো মানতোভানি সাংবাদিকদের বলেন, তাদের হাতকড়া ও পায়ে শিকল পরিয়ে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। এরপর এথেন্সগামী বিমানে তোলা হয়। তিনি বলেন, “তারা আমাদের মারধর করেছে। লাথি মেরেছে, ঘুষি মেরেছে। এভাবে করে তারা বলেছে, ‘ইসরায়েলে স্বাগতম।’”
সর্বশেষ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজামুখী নৌবহরকে আটকে দেয় ইসরায়েল। তখন গাজার দিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে যাওয়া বৈশ্বিক সংহতি নৌবহরের ৫০টির বেশি নৌকার শেষ অংশটিও ইসরায়েলি বাহিনী থামিয়ে দেয়। ইসরায়েলের এই অভিযান ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়ে। স্পেন, ব্রাজিল ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১০টি দেশের মন্ত্রীরা একে আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন।
কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করার পর ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে। সেখানে দেখা যায়, হাত বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা অধিকারকর্মীদের তিনি বিদ্রূপ করছেন।
এর জবাবে ফ্রান্স, কানাডা, স্পেন, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ তাদের রাজধানীতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের তলব করে ক্ষোভ প্রকাশ করে। একই সময়ে ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা বেন গাভিরের আচরণে ‘স্তম্ভিত’ বলে মন্তব্য করেন এবং একে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন।
মনোয়ারুল হক/
