যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল রিপাবলিকানরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৫ নভেম্বর): মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বেশ ভালো সাফল্য অর্জন করেছে, যার জেরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছু আসন হারিয়ে থাকে; তবে এবারের ফলাফলকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত দুই বছরের শাসনকাল নিয়ে সাধারণ ভোটারদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষেরই স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ, ডাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তায় ধস এবং ডেমোক্র্যাটদের অত্যন্ত সুচিন্তিত নির্বাচনী কৌশল—এই সবকিছুই রিপাবলিকানদের এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যগত ভোটারদের পাশাপাশি হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের সমর্থন হাতছাড়া হওয়াটাও দলটির জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপত্তি ডেকে এনেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে ক্ষমতাসীন দলের এই শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে মূলত পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে জনরোষ

মার্কিন নাগরিকদের এবারের ভোটের অন্যতম প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচারণার সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার এই করুণ চিত্র প্রকাশ পায়। যেমন—নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে জানান, জ্বালানি থেকে শুরু করে মুদি দোকানের প্রতিটি পণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তিনি এবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যানেও এর সত্যতা মেলে; বছরের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৭ শতাংশে ঠেকেছে এবং একই সময়ে ডিজেলের দামও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৯ শতাংশ মানুষ মূল্যস্ফীতির কারণে আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়েছেন এবং এর জন্য ৬০ শতাংশের বেশি ভোটার সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল নীতিকেই দায়ী করেছেন। অর্থনৈতিক এই চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় রিপাবলিকানদের।

ইরান সংকট ও মার্কিনিদের ক্ষোভ

রিপাবলিকানদের এই ভরাডুবির পেছনে ইরান সংঘাতও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নাগরিকের কাছে এই যুদ্ধটি শুরু থেকেই অজনপ্রিয় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) শিবিরের অনেক নেতাকর্মীও একে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কারণ নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সময় ট্রাম্প নতুন কোনো সংঘাতে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াকে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। আর প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোটার স্বীকার করেছেন যে ইরান যুদ্ধ তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। পরাজয়ের পর ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধের এই নেতিবাচক প্রভাবের কথা স্বীকার করলেও ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে ওই সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প খোলা ছিল না।

ডেমোক্র্যাটদের সুকৌশলী প্রচারণাপদ্ধতি

বিরোধী দলের এই সাফল্যের পেছনে তাদের প্রচারণার ধরনও ছিল বেশ কার্যকর। বড় বড় জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে তারা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংকটকেই বেশি গুরুত্ব দেন। জীবনযাত্রার খরচ হ্রাস এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর মতো সরাসরি জনসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোই ছিল তাদের প্রচারণার মূল হাতিয়ার।

টেক্সাসের সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো বা কানসাসের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের ব্যক্তিগত মূল্যবোধকে সামনে এনে ভোটারদের মন জয় করেছেন। অন্যদিকে সাউথ ক্যারোলাইনায় সাবেক শিশু বিশেষজ্ঞ ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভাবনীয় জয় তুলে নেন।

মিশিগানে আব্দুল এল-সায়েদ রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানোর পক্ষে কথা বলেন, আর জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফ জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতির ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। ট্রাম্পের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জর্জিয়াতেও ডেমোক্র্যাট নেতার এই বড় জয় ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের এই সুনিপুণ প্রচারণার কৌশল যে দারুণ কাজ করেছে, ট্রাম্প নিজেও একপর্যায়ে তার পরোক্ষ প্রশংসা করেছেন। বিপরীতে, সাধারণ মানুষের মূল উদ্বেগগুলোকে আমলে না নেওয়ায় কেন প্যাক্সটনের মতো কিছু রিপাবলিকান প্রার্থী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় নিম্নমুখী প্রবণতা

রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য এবারের নির্বাচনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনসমর্থন। মূল্যস্ফীতি কিংবা ইরান যুদ্ধের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোর সঙ্গে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় ভোটারদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত দলের প্রার্থীদের ওপর গিয়ে পড়ে।

শুধু বিরোধীরাই নন, খোদ রিপাবলিকানদের নিজেদের ভোটব্যাংকেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাসের স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গেছে। এর ফলে গত নির্বাচনে যেখানে ট্রাম্প অনায়াসে জয় পেয়েছিলেন, এবার সেই অঙ্গরাজ্যগুলোতেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়েছে দলের প্রার্থীদের।

প্রচারণাকালে ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানান যেন ব্যালটে খোদ তাঁর নামই রয়েছে, তবে এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি। উল্টো দলীয় প্রচারে ট্রাম্পকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। নির্বাচনের আগের জনমত জরিপগুলোতেও দেখা গিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্পের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন; অথচ ওয়াশিংটনে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি বাসভবনের পেছনের একটি রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কারকাজ নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করেন, যা ভোটারদের সঙ্গে তাঁর মানসিক দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনচ্যুতি

গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রিপাবলিকানদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, যা ট্রাম্পের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমীকরণে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে।

বিশেষ করে টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্ত এলাকার হিস্পানিক অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের অভাবনীয় সাফল্য রিপাবলিকানশিবিরকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ওই অঞ্চলের তিনটি আসনই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা দখল করেছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, গত নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিকপ্রধান কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান প্রশাসনের অভিবাসন নীতি নিয়েও মানুষের অসন্তোষ বেড়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিই-এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও ডেমোক্র্যাটদের প্রতি সমর্থন ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক সংকট, ইরান যুদ্ধের ধাক্কা, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারানোর মতো বিষয়গুলোই মূলত এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বিবিসির বিশ্লেষণ

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ