বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত 

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৪ নভেম্বর):‘২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে কোনো বেকার থাকবে না। সব জেলার বেকারদের দেবেন কর্মসংস্থান, করবেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, হবেন সবাই স্বাবলম্বী, এমন প্রচারণা চালিয়ে   বেকারদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে নিজেই হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সামসুদ্দিন আহমেদ রিয়াদ। প্রতারিত যুবকদের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে দেশ ছেড়েছেন তিনি। পুলিশ কমিশনারের কাছে জমা দেয়া অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেড়িয়ে এসেছে।

জানা গেছে, ঢাকার  ‘এজেআর কুরিয়ার সার্ভিস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামসুউদ্দিন আহমেদ রিয়াদ বেকারদের ২০৫০ সালের মধ্যে স্বাবলম্বী করার মুখরোচক প্রচারণা চালান। সব জেলার বেকারদের কর্মসংস্থান ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সবাই হবেন স্বাবলম্বী। তার এই ভুয়া প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে হাজার হাজার যুবক প্রতারণা শিকার হন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বেকারদের চাকরি দেয়ার নাম করে সামসুউদ্দিন আহমেদ রিয়াদ ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাদের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক ও তিন-চারটি করে ফাঁকা স্ট্যাম্প জামানত হিসাবে নেন। চাকরিতে কিছু দিন যেতে না যেতে বিভিন্ন অজুহাতে রিয়াদ তাদের করেন চাকরিচ্যুত। পরে রিয়াদ ফেরেন তার আসল চেহারায়। ফাঁকা চেক ও স্ট্যাম্পে মোটা অঙ্কের টাকা বসিয়ে রিয়াদ দেন চেক ডিজঅনার মামলা। চেক মামলায় রায় হয়ে যাবে ভয় দেখিয়ে রিয়াদ আদায় করেন টাকা। এখানে চাকরির জন্য যারাই এসেছেন, ফিরতে হয়েছে মামলা নিয়ে। অনেকে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন। জরিমানা দিয়েও রেহাই পাননি অনেকে।

জানা যায়, চাকরি প্রার্থীরা অনেককে টাকার জন্য অফিসের সম্পদ চুরি, ডকুমেন্ট চুরি, টাকা চুরির মামলা দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি মাসুদ হোসাইনসহ বেশ কয়েক ভুক্তভোগী ডিএমপির পুলিশ কমিশনারের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, তাকে মিথ্যা চুরির মামলা দেয়া হয়েছে। ১০ লাখ টাকা চুরির মামলায় এক মাস কারাগারে থেকে জামিনে বের হলে আবারও তাকে দেয়া হয় আরেকটি চেকের মামলা। এ মামলায় দেখানো হয় ১৩ লাখ টাকা চুরির কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে না পারায় মামলাটি আদালত থেকে খারিজ হয়ে যায়। পরে তাকে ওই চেকের মামলার রায় হয়ে যাবে বলে ভয় দেখায়। এক পর্যায়ে তিনি চার লাখ টাকায় রফা করেন। চার লাখ টাকা তিনি গ্রামের বাড়ি থেকে ধার করে এনে দিলেও এখনো তাকে কোনো লিখিত কাগজ দেয়নি। কাগজ চাইলে বলে পরে আসেন।

আরেক ভুক্তভোগী এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা রুবেল গণমাধ্যমকে বলেন, আমার নামে প্রথমে আট লাখ টাকার একটি চুরির মামলা দেয়। রংপুরে আমি ৪৪ দিন কারাগারে ছিলাম, জামিনে বের হওয়ার পর ওই যে আমার চাকরিতে যোগদানের সময় একটি ব্ল্যাংক চেক ছিল, সেই চেকে আমাকে আবার ১৬ লাখ টাকার মামলা দেয় ঢাকার আদালতে। মামলা তোলার জন্য বারবার অফিসে গেলে আমার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে।

এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের আরেক ভুক্তভোগী সাবেক কর্মকর্তা মফিজদ্দিন (২৫) গণমাধ্যমকে বলেন, মামলাবাজ এমডি আমার নামে মোট পাঁচটি মামলা দিয়েছে। তার মধ্যে একটা চুরির মামলা, একটা হাফ মার্ডার মামলা, একটি অপহরণ মামলা, দু’টি চেকের মামলা।

আরেক ভুক্তভোগী মাসুদ হোসাইন বলেন, আমি ২০১১ সাল থেকে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসে কর্মরত ছিলাম। চাকরিতে নিয়োগের সময় কোম্পানিটি আমার একটি ব্ল্যাংক চেক রাখে ফেরতযোগ্য বলে। কোম্পানির বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি দেখে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিই। অব্যাহতির দুই বছর পর কোম্পানিটিতে থাকা আমার ওই ব্ল্যাংক চেকে আমাকে ২৯ লাখ ২৭ হাজার ৬০০ টাকার একটি মামলা দেয়।

কাগজে-কলমে কোম্পানিটির কাছে আমি পাঁচ মাসের বেতন পাই, সেটি না দিয়ে উলটো আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে প্রতিনিয়ত। তাই আমি কোম্পানির মামলাবাজ মালিক রিয়াদের যথাযথ শাস্তি দাবি করছি।

জানা গেছে, রিয়াদ নোয়াখালী সেনবাগের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। ব্যবসার নামে বেকারদের কাছ থেকে এভাবে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এখন তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। এ ব্যাপারে এজেআর কুরিয়ারের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ