রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৪ নভেম্বর): বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে তৈরি হওয়া জটিলতা দূর করতে চীনের কাছে সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এই আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

সাক্ষাৎকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান লিউ হাইশিং। এর প্রতিউত্তরে প্রধানমন্ত্রীও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দেশটির প্রিমিয়ার লি ছিয়াংকের সুস্বাস্থ্য ও সফলতা কামনা করে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান।

লিউ হাইশিং বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের সময় দুই দেশের পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের যৌথ ঘোষণা এসেছে। ওই ঘোষণার পথ ধরে দুই দেশের সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নযাত্রায় বেইজিংয়ের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের প্রতি চীনের নীতিগত অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই মিত্রতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একইসাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির উচ্চ সম্ভাবনার ওপরও আস্থা প্রকাশ করেন চীনা মন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বহু বছর ধরে দুই দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এই সম্পর্কের একটি বিশেষ ও গভীর স্থান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের এই বন্ধুত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং তা আগামী প্রজন্মের কাছে সফলভাবে পৌঁছে দেওয়া এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও মৈত্রীর এই ধারা আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

তারেক রহমান জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চীন সফরের অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত বাংলাদেশে প্রথম খাল খনন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই কর্মসূচি দেশের কৃষি খাতের বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিল। বর্তমান প্রশাসনও দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের কল্যাণে আসবে। পাশাপাশি এটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে তিনি যোগ করেন।

এ সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দলীয় যোগাযোগ ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার বিষয়েও উভয়পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছায়।

লিউ হাইশিং জানান, দুই দলের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও বহুমাত্রিক ও গভীর করতে বেইজিং অত্যন্ত আগ্রহী। এ সময় তিনি বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে চীন সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।

উভয়পক্ষের বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এছাড়া রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণে চীনের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন লিউ হাইশিং।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে জানান যে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে অবস্থান দেশের অর্থনীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা, জনমিতি এবং পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট কাটিয়ে উঠতে তিনি চীনের জোরালো ভূমিকা ও সহযোগিতা কামনা করেন।

জবাবে লিউ হাইশিং জানান, রোহিঙ্গা সংকটের গভীরতা সম্পর্কে চীন পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগের বিষয়টি তিনি সরাসরি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অবহিত করবেন বলে আশ্বাস দেন।

আলোচনাকালে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদারত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের মেলবন্ধন আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, দলের ভাইস চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

অন্যদিকে, চীনা প্রতিনিধিদলে লিউ হাইশিংয়ের সাথে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ