এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে ইসি 

নিউজডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৪ নভেম্বর): জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জালিয়াতির চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কতিপয় কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ গ্রেফতারের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই অভিযোগে আমাদের অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা করেছি। তাদের গ্রেফতারের ব্যবস্থাও করেছি। সুতরাং আমরা ছাড় দিচ্ছি না।’

জালিয়াতি রোধে ইসির অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হওয়ার পরই কেবল সংশোধনের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে কমিশন। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

অপব্যবহারের বিষয় তুলে ধরে সিইসি জানান, ‘অনেক ক্ষেত্রে নাম বদল করে সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। অনেকে উত্তরাধিকার বা ওয়ারিশ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য এনআইডি সংশোধন করেন। অনেকে আবার জালিয়াতি করে পাসপোর্ট পরিবর্তনেরও চেষ্টা চালিয়েছেন। এই কারণে যাচাই-বাছাই না করে সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে বা তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করে দেওয়া সম্ভব নয়।’

ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠী জেলার কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোড়া. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে ইসি। এ ছাড়া জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পঞ্চগড় সদরের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

কী ধরনের অসংগতি পাওয়া যাচ্ছে

কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, অনেক আবেদনে পিতা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর, আবার মা ও মেয়ের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর মাত্র। তাছাড়া কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত সনদ পাওয়া যাচ্ছে।

এসব তথ্য যাচাই না করে সংশোধন করা হলে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহ করার বড় রকমের ঝুঁকিও থেকেই যায়।

সিইসি বলেন, ‘এমনও শোনা যায়, বিদেশি নাগরিক বা রোহিঙ্গারা আমাদের দেশের নাগরিক সেজে এনআইডি তৈরি করে ফেলছে। এই কারণে এসব বিষয় সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই, তদন্ত ও পর্যালোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।’

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উল্লেখ করেন, অনেক আবেদনকারী এমন জন্মতারিখ পরিবর্তনের আবেদন করেন, যা তাদের আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘একজনের জন্ম ১৯৯৭ সালে, যিনি ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হন। পরবর্তীতে তিনি জন্মসাল ২০০২ করতে চান। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধনের সময় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৩ বছর, অথচ ভোটার হওয়ার নির্ধারিত বয়স ১৮ বছর। এ ধরনের আবেদন কীভাবে গ্রহণ করা সম্ভব?’

তিনি আরও বলেন, বিদেশে যাওয়ার বিভিন্ন সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত নানা অসুবিধার কথা উল্লেখ করে অনেকেই মানবিক বিবেচনায় সংশোধনের অনুরোধ জানান। কিন্তু যথাযথ যাচাই ছাড়া তা অনুমোদন করলে পরবর্তীতে ইসিকেই মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়।

কোন ধরনের নথিপত্র যাচাই করা হয়

কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ সাধারণ সংশোধন উপজেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। তবে নাম, পিতা-মাতার নাম কিংবা বয়সসহ একাধিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের জটিল আবেদনগুলো উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদসহ সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথি গভীরভাবে যাচাই করা হয়। বিশেষ করে পিতার নাম পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট পিতার এনআইডি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।

উল্লেখ্য, শুধুমাত্র হলফনামার ভিত্তিতে কোনো তথ্য সংশোধন করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘আপনি যদি আপনার নিজের নাম ও বাবার নাম পরিবর্তন করতে চান, সে ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি আপনার অন্যান্য ভাই-বোনের এনআইডি নিয়ে আসেন। তাদের এনআইডিতে বাবার নাম কী লেখা রয়েছে তা মিলিয়ে দেখা হবে।’ তথ্যের সঠিকতা ও যথার্থতা প্রমাণের জন্যই মূলত এসব তথ্য চাওয়া হয় বলে তিনি জানান।

এনআইডি সংশোধন করতে আসা ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা

সম্প্রতি এনআইডি সংশোধনের কাজে ইসিতে এসেছিলেন যশোরের কেশপুরের বাসিন্দা হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম)।

তিনি জানান, প্রায় ছয় মাস আগে তিনি তার স্ত্রীর নাম সংশোধনের জন্য আবেদন করেছেন। তখন তাকে জানানো হয়েছিল যে, তার স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে এলে তবেই তা সংশোধন করে দেওয়া হবে।

এরপর তিনি একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে পুনরায় ইসিতে উপস্থিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাকে জানান, নাম সংশোধনের জন্য তার স্ত্রীর ভাই-বোনের প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে এবং বায়োমেট্রিক প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি আরও বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্ট জমা দেওয়ার দাবি জানানো হয়, যা তিনি এখনো পুরোপুরি সংগ্রহ করতে পারেননি।

১৩ লাখ ৫৫ হাজার আবেদন বাতিল

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জমা পড়া মোট ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে মোট ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

আবেদন বাতিলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিইসি জানান, ‘যথাযথ তথ্য না থাকা এবং জন্মসনদ না থাকাই এর প্রধান কারণ।’ অনেকের ক্ষেত্রে একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি কিংবা স্নাতকের সনদ থাকায় নির্দিষ্ট কোনো একটি ডকুমেন্টের ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আবেদন বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবারও নতুন করে আবেদন করতে পারবেন। যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া কিংবা নিশ্চিত না হয়ে কখনোই কোনো আবেদন বাতিল করা হয় না বলেও সিইসি স্পষ্ট করেন।

আখতার আহমেদ যোগ করেন, বাতিলের মোট সংখ্যা মানেই এত বিপুল সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত আবেদনকারী নন। কারণ, একই ব্যক্তি চার-পাঁচবারও আবেদন করে থাকেন। অনেক সময় একই আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে একটি তথ্য সংশোধিত হলেও বাকিগুলো বাতিল হতে পারে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আরও বলেন, উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিলের পরও সচিব পর্যায়ে আপিল করার সুযোগ রয়েছে, সেখানেও আবেদন বাতিল হতে পারে।

তিনি জানান, কোনো কোনো আবেদন ছয় থেকে সাতবার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। ফলে বাতিলের সামগ্রিক সংখ্যা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত আবেদনকারীর সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

প্রবাসীদের ক্ষেত্রে উদ্ভূত জটিলতা

কর্মকর্তারা জানান, প্রবাসীদের সেবা সহজ ও দ্রুততর করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। যাদের কাগজপত্র সম্পূর্ণ সঠিক ও নির্ভুল থাকবে, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিইসি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে অনেকগুলো দূতাবাসে প্রবাসীদের জন্য ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু করেছি।’

তবে তিনি এও বলেন যে, অনেকেই সঠিক পাসপোর্ট নিয়ে হয়তো বিদেশে যাননি, আবার অনেক সময় বিভিন্ন দালালের মাধ্যমেও তারা বিদেশে গিয়ে থাকেন। এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হয়। বিশেষ করে সৌদি আরবে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে কাজ করছে বলে বিভিন্ন রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে।

সিইসি আরও বলেন, ‘যদি সব তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক থাকে, তবে আমরা অবশ্যই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রবাসীদের এই বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব। কারণ প্রবাসীরা আমাদের দেশের লাইফলাইন বা প্রাণস্পন্দন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরই মূলত আমাদের দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরকে ভিআইপি মর্যাদায় এই কাজটি সম্পন্ন করে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।’

আখতার আহমেদ বলেন, অনেকেই পূর্বে এনআইডি তৈরি করলেও পরবর্তী সময়ে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন, যার ফলে তথ্যের মধ্যে মারাত্মক অমিল তৈরি হয়। জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় যদি এনআইডির সঙ্গে পুরোপুরি মিল রাখা হয়, তবে এই ধরনের সমস্যা সহজেই এড়ানো সম্ভব।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বয়সের শর্ত থাকায় অনেকেই বয়সসহ অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করে ফেলেন। পরবর্তীতে যখন তারা বড় ধরনের সমস্যায় পড়েন, তখন বাবা কিংবা মায়ের নাম পরিবর্তনের জন্য আবেদন করে থাকেন।

কোন সংশোধন সহজ, কোনটি জটিল

ইসির মূল লক্ষ্য হলো, নাগরিকেরা যেন নিবন্ধনের সময়ই একদম সঠিক তথ্য প্রদান করেন, যাতে পরবর্তীতে অপ্রয়োজনে সংশোধনের কোনো প্রয়োজন না পড়ে। স্থানান্তরের কারণে ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থা পরিবর্তন, এমনকি ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে সহজেই সংশোধন করা সম্ভব।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় কিংবা জন্মতারিখের মতো অত্যন্ত মৌলিক তথ্যগুলো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ কঠোরভাবে যাচাই করা অপরিহার্য।

সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ