মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা জাহরা মানসুরি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (৩০ সেপ্টেম্বর): মরক্কোর রাষ্ট্রক্ষমতায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হলো। দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফাতিমা জাহরা মানসুরি। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ তাকে এই দায়িত্ব প্রদান করেন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার রাজনৈতিক দল সর্বোচ্চ আসন অর্জন করার পর তাকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ মানসুরিকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৩৯৫ আসনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে মানসুরির দল ‘অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি’ (পিএএম) ৯৭টি আসন নিশ্চিত করে।
পেশাগত জীবনে আইনজীবী ৫০ বছর বয়সী মানসুরি পূর্বে মরক্কোর জাতীয় পরিকল্পনা, আবাসন, নগর পরিকল্পনা ও নগরনীতি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়াও তিনি দেশটির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ শহর মারাকেশের মেয়র হিসেবেও সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০০৮ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের এক উপদেষ্টার উদ্যোগে পিএএম প্রতিষ্ঠিত হয়। দলটি মূলত সামাজিক আধুনিকায়ন এবং তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ধারণ করে। ইসলামপন্থি দল ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’র (পিজেডি) প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তারা পরিচিত।
মরক্কো একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। দেশটির প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি এবং অন্যান্য কৌশলগত বিষয়ে রাজার বিশাল ক্ষমতা সংরক্ষিত রয়েছে। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী দলের প্রধানকে সরকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন রাজা।
নির্বাচনে পিএএম ৯৭টি আসন পেয়ে শীর্ষে থাকলেও, ৬৬ আসন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল উদারপন্থি ‘ন্যাশনাল র্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস’ (আরএনআই)। এছাড়া ৬৫ আসন নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইস্তিকলাল পার্টি এবং ইসলামপন্থি পিজেডি পেয়েছে ৫৪ আসন। পার্লামেন্টে এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৯০টির বেশি (১৯৮টি) আসন। ফলে নতুন সরকার গঠনের জন্য মানসুরিকে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে হবে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় পিএএম জানিয়েছিল, বিদায়ী সরকারের শরিক দল আরএনআইয়ের সঙ্গে তারা আর জোটে যাবে না। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন নীতিগত ত্রুটির কারণে দল দুটি পূর্বে পরস্পরকে দোষারোপ করেছিল। তবে সরকার গঠন সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে মানসুরি গণমাধ্যমকে জানান, সম্ভাব্য কোনো অংশীদারের প্রতি তার দলের কোনো ধরনের ‘নির্দিষ্ট পূর্বশর্ত বা লাল রেখা’ নেই। তিনি অতীতের মতপার্থক্য ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন।
এদিকে পিজেডির সাবেক প্রধান ও দলটির নেতা আবদেলিলাহ বেনকিরান জানিয়েছেন, তাদের দল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে। অন্যদিকে, পার্লামেন্টে তুলনামূলকভাবে কম আসন জিতেছে তিনটি বামপন্থি দল।
আসন্ন দিনগুলোতে নতুন সরকারকে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিমূলক কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা। উল্লেখ্য, পর্তুগাল ও স্পেনের সঙ্গে যৌথভাবে এই টুর্নামেন্টের আয়োজক মরক্কো। বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশটির অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বড় বিনিয়োগ প্রকল্প চলমান রয়েছে।
পাশাপাশি তরুণ সমাজের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দূর করার লক্ষ্যে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করাও নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জনসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার চাপ রয়েছে সরকারের ওপর।
উল্লেখ্য, এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশ কম। প্রায় ৩৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা আগের নির্বাচনে প্রায় ৫০ শতাংশ ছিল।
মরক্কোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও প্রশাসনিক পদে এর আগেও নারীরা দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদায়ী মন্ত্রিসভাতেও চারজন নারী মন্ত্রী ছিলেন। তবে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো নারী সরকারপ্রধানের আসনে বসলেন। তাছাড়া আরব বিশ্বের ইতিহাসে তিনি দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিউনিসিয়ায় নাজলা বুদেন এই মর্যাদাপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সূত্র : রয়টার্স
মনোয়ারুল হক/
