বিশ্বমঞ্চে অনন্য ইতিহাস: জাতিসংঘ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় ভাষণ

বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৫ সেপ্টেম্বর): জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মাতৃভাষা বাংলায় সাবলীল ভাষণ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে এক বিরল ও অনন্য রেকর্ড গড়লেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তিনি একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করলেন।

জাতিসংঘের বিরল পারিবারিক ঐতিহ্য ও বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ

সম্পূর্ণ বাংলায় দেওয়া এই প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জাতিসংঘের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে একই পরিবারের বাবা, মা ও ছেলে—এই তিনজন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার এমন কোনো দ্বিতীয় নজির নেই। পারিবারিক সেই সুমহান ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বমঞ্চে নিজের মাতৃভাষায় দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চেতনা জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্ক সময় বিকেলে সাধারণ পরিষদ হলে এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি অনুষ্ঠিত হয়।

স্মৃতিকাতর সূচনা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের রূপরেখা

ভাষণের শুরুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে আন্তরিক সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন:

“জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।”

এবারের এই ঐতিহাসিক ভাষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় হুমকি জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন, গতিশীল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক বিষয়াবলি এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পায়।

চার দশকেরও অধিক সময়ের ঐতিহাসিক পারিবারিক সম্পৃক্ততা

তারেক রহমানের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বিশ্বসংস্থা জাতিসংঘের সঙ্গে তাঁর পরিবারের চার দশকেরও অধিক সময়ের ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততায় যোগ হলো এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল মাত্রা। এই পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ধনী ও দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর ক্রমবর্ধমান ব্যবধান দূরীকরণ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। পাশাপাশি শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৩ বছর। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গর্বিত মাতা এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের দাপ্তরিক নথিপত্র অনুসারে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের দীর্ঘ এই সময়ে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে ভাষণ দেওয়ার অনন্য গৌরব অর্জন করেন।

শুধু সাধারণ অধিবেশনই নয়, তিনি বিভিন্ন বৈশ্বিক ও উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:

  • ১৯৯৫ সাল: জাতিসংঘের সুবর্ণজয়ন্তী (৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী) উপলক্ষে বিশেষ সভা।
  • ২০০২ সাল: শিশু বিষয়ক বিশেষ গুরুত্বসম্পন্ন ২৭তম বিশেষ অধিবেশন।
  • ২০০৫ সাল: জাতিসংঘের ৬০তম অধিবেশন চলাকালীন আয়োজিত দুটি পৃথক উচ্চপর্যায়ের সভা।

পরিবারের এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক সাফল্যের পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই ৮১তম অধিবেশনের ভাষণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বিশ্বদরবারে আরও এক ধাপ উচ্চতায় নিয়ে গেল।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ