নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৪ সেপ্টেম্বর): আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিলে ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই আহ্বান জানান তিনি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে এই সভাটি আয়োজিত হয়।
সভায় বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা সকলে মিলে একসাথে হাত মেলাই এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে নিরাপদ ও টেকসই একটি পৃথিবী গড়ে তুলি।’
জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত থেকে রক্ষ পেতে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে— জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে ও সুলভ অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখা, জলবায়ু-বান্ধব প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার প্রসারিত করা, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত তহবিল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ বিশ্বের অন্যতম ভুক্তভোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রের পানি বেড়ে যাওয়ায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনজীবিকা যেমন হুমকির মুখে পড়বে, তেমনি দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তাও মারাত্মক সংকটে পড়বে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান বলে উল্লেখ করেন সরকারপ্রধান। তিনি জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজন কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা না পেলে বাংলাদেশের পক্ষে এই বিশাল ঝুঁকি একা মোকাবিলা করা অসম্ভব।
দেশের নিজস্ব জলবায়ু কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানিসম্পদ সংরক্ষণ, আকস্মিক বন্যা মোকাবিলা, জলাশয়গুলোর আগের রূপ ফিরিয়ে আনা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননকাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা ব্যারাজের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে চলেছে।
২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ সবুজ ও নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে মেটানোর টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পাটশিল্পের বহুমুখীকরণ, পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবস্থার প্রচলন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সার্কুলার অর্থনীতির মতো সবুজ শিল্পের প্রসারে কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে একটি জাতীয় কার্বন বাজার স্থাপনের উদ্যোগও চলমান রয়েছে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কেবল নিজ দেশের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের পক্ষে এসব লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভবপর নয়। ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সক্ষমতা’ এই নীতির আলোকেই সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি করণীয় নির্ধারণের ওপর জোর দেন:
প্রথমত, প্যারিস চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখতে বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সংকটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কার্যক্রমে সময়োপযোগী, পূর্বাভাসযোগ্য ও সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
তৃতীয়ত, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তির ওপর সবার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি ন্যায়পরায়ণ ও সমতাপূর্ণ উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সুলভ অর্থায়ন, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করতে হবে।
পঞ্চমত, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিল সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে সেই তহবিল পুনর্পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ তার নিজস্ব জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্ববাসীর কাছ থেকে কার্যকর অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটিতে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্ক পর্বে বাংলাদেশের পক্ষে তিনি ভাষণ দেবেন।
মনোয়ারুল হক/
