মেঘনা গ্রুপের ঋণপত্র বাতিলের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২২ সেপ্টেম্বর): নিজেদের মালিকানাধীন জাহাজ নতুন করে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মেঘনা গ্রুপের প্রায় ৪১০ কোটি টাকার ঋণপত্র (এলসি) বাতিলের কড়া নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বিশ্বস্ত সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

জানা গেছে, বিএফআইইউর নিবিড় অনুসন্ধানে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসার পর মেঘনা ব্যাংককে এই কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিএফআইইউ, মেঘনা ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও কোনো সন্তোষজনক সমাধান বা সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলশ্রুতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এলসি বাতিলের চূড়ান্ত নির্দেশ আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএফআইইউর প্রধান ড. ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন খবরের কাগজকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়াই বিদেশে ভুঁইফোড় কোম্পানি খোলা এবং নিজের মালিকানাধীন জাহাজ নিজেদেরই অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় আমদানির নামে মূলত অর্থ পাচারের অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের তদন্ত কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় মেঘনা গ্রুপের এলসি বাতিলের নির্দেশ কার্যকর করা হয়েছে।’

এদিকে মেঘনা ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা পাওয়ার পর তারা অবিলম্বে ঋণপত্রটি বাতিল করার জন্য মেঘনা গ্রুপকে নোটিশ দিয়েছেন।

বিএফআইইউর বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ মেঘনা ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ‘এমভি মেঘনা পার্ল’ নামের একটি বৃহৎ বাল্ক ক্যারিয়ার আমদানির জন্য ৩২৫২২৬০১০২২০ নম্বরের এলসি ইস্যু করা হয়েছিল। ওই ঋণপত্রে রপ্তানিকারক এবং মূল সুবিধাভোগী হিসেবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘মেঘনা ট্রেড অ্যান্ড কমার্স পিটিই লিমিটেড’-এর নাম ব্যবহার করা হয়।

অথচ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা লয়েড’স লিস্ট ইন্টেলিজেন্স, মে ইন্টারন্যাশনাল এবং আইএমবির তথ্য ও দলিলপত্র পর্যালোচনা করে বিএফআইইউ নিশ্চিত হয়েছে যে, এলসি খোলার অনেক আগে থেকেই ওই জাহাজটির মূল মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মেঘনা গ্রুপের হাতেই ছিল।

লয়েড’সের রেকর্ড অনুযায়ী, পানামার পতাকাবাহী ‘সিএমবি ব্রুয়েগেল’ নামের এই জাহাজটি ২০১৯ সালের অক্টোবর মাস থেকেই মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে এটি বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ হিসেবে সমুদ্র চলাচল শুরু করে এবং ২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মেঘনা পার্ল’।

বিশ্লেষকদের মতে, একপর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে প্রতিষ্ঠান খোলা হয় এবং অন্য দিকে নিজেদের পূর্বের কেনা জাহাজই নতুন করে আমদানি করার নাটক সাজানো হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে সাজানো এই ঋণপত্র খোলার পেছনে সম্পূর্ণভাবেই অর্থ পাচারের দুরভিসন্ধি ছিল বলে মনে করছে বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ