সাংসদ গাজী নজরুলের বাসা থেকে উদ্ধার মরিয়মের শেষ চিঠি, বিশ্বাসের চরম মূল্য আর শেষ পরিণতির বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২১ সেপ্টেম্বর): জাতীয় সংসদের প্যাড, সাদাকাগজ কিংবা কখনো লাল-কালো কালির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে এক জটিল সম্পর্কের না বলা উপাখ্যান। প্রতিটি লাইনেই যেন জমে আছে গভীর আবেগ, চরম বিশ্বাসভঙ্গের আর্তনাদ, পরাজয়ের গ্লানি আর আত্মসম্মান রক্ষার আপসহীন এক ঘোষণা।

সাংসদ গাজী নজরুলের বাসভবন থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা এসব চিঠি ও চিরকুটে সম্পর্কের নানা চড়াই-উতরাইয়ের চিত্র বেরিয়ে এসেছে। ভালোবাসার আড়ালে সেখানে ছিল প্রতারণার অভিযোগ, জটিল টানাপোড়েন এবং তীব্র মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। নিজেকে সম্পর্কের দাবার গুটি হিসেবে আবিষ্কার করার বেদনার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত মাথা না নোয়ানোর প্রত্যয়ও স্পষ্ট হয়েছে এসব লেখায়।

চিঠির কিছু অংশে দেখা যায়— ‘‘তুমিই তো ছিলে প্রতিপক্ষের প্রধান সেনাপতি’’, ‘‘আমি হেরে গেছি—তুমি জিতে গেছো’’ কিংবা ‘‘ততটা সস্তা নই আমি’’—এর মতো তীক্ষ্ণ বাক্যগুলো সম্পর্কের ভেতরের চরম মানসিক দ্বন্দ্বের কথা বলে দেয়।

জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাডে কালো কালিতে লেখা একটি পাতায় গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে উল্লেখ করা হয়—

“আমি অন্ধ বিশ্বাস নিয়েই তার সাথে লড়াইয়ে নেমেছিলাম, কিন্তু ময়দানে টিকে থাকতে পারিনি, হেরে গেলাম। আর জয়ী বা হব কি করে, লড়াইয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে টের পেলাম—যিনি পাশে থাকার কথা, তিনিই তো ছিলেন উল্টো শিবিরের সেনাপতি।”

আরেকটি সাধারণ কাগজে নিজের অবস্থান ও অনুভূতির টানাপোড়েন ব্যাখ্যা করে লেখা হয়েছে—

“তিনি ছিলেন অন্য একজনের স্বামী; কাগজে-কলমে অধিকার ছিল বৈধ স্ত্রীরই। আর আমি ছিলাম নিছক এক বোকা…!! অন্য কারও জীবনসঙ্গীকে নিজের পছন্দের মানুষ বানিয়ে নিয়েছিলাম…!! কাউকে আংশিক পাওয়ার চেয়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলা অনেক বেশি সম্মানের, কারণ ভালোবাসা কখনো ভাগাভাগি করার বিষয় নয়—তা হয় পূর্ণাঙ্গ, নয়তো অপূর্ণ!”

বিশ্বাসের বদলে ‘দাবার গুটি’র জীবন

বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে অন্য একটি পাতার লেখায়। সেখানে বলা হয়েছে—

“তিনি প্রস্তাব দিয়েছিলেন—আজ থেকে আমরা বন্ধু, চলো একটা খেলা খেলি। আমিও কোনো জটিলতা না ভেবে সরল মনে সেই খেলায় রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কে জানত—তার পাতা সেই খেলায় আমিই ছিলাম কেবল এক অবলা দাবার গুটি।”

পরাজয় এবং পরিণতির কঠোর হুঁশিয়ারি

জাতীয় সংসদের প্যাডের আরেকটি অংশে ক্ষোভ ও ভবিষ্যতের পরিণতি নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—

“আজ আমি হেরেছি আর তুমি জিতেছ। এর কারণ একটাই—আমি তোমাকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তুমি আমাকে ঠকিয়ে বিজয়ের মুকুট পরতে পেরেছ। আমি বুক ফাটা কষ্ট চেপে মুখে হাসি ধরে রেখেছিলাম—আজ দেখে নাও, এই হাসির আড়ালের বেদনাই এক দিন তোমার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।”

আত্মসম্মানের আপসহীন উচ্চারণ

লাল কালির ছোঁয়ায় লেখা ছোট একটি চিরকুটে নিজের আত্মমর্যাদার কথা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—

“কেবল নিখাদ মায়ার টানে বারবার তোমার সামনে নুয়ে পড়েছি… তা না হলে তুমি আমাকে যতটা সহজলভ্য ভাবছ, আমি ঠিক ততটা সস্তা নই…!”

তারিখযুক্ত ধর্মীয় অনুসরণের পাতা

উদ্ধার হওয়া এসব দলিলের মধ্যে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ সংবলিত একটি বিশেষ পাতা পাওয়া গেছে। সেখানে মূলত ঘুমানোর আগে পালনীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমল ও নিয়ম লিপিবদ্ধ করা ছিল।

পাতাটিতে উল্লেখ রয়েছে—

‘‘১২-০৭-২০২৬। ঘুমানোর আগে ৬টি আমল: কালেমা পাঠ, দরুদ শরিফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসি, ২১ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, ৩ বার আস্তাগফিরুল্লাহ, ১১ বার দরুদ শরিফ এবং ১১ বার ইয়া আরহামার রাহিমিন।’’

সবমিলিয়ে উদ্ধার হওয়া এসব চিরকুট ও চিঠিতে প্রেম, বিশ্বাসের অমর্যাদা, গভীর অভিমান এবং আত্মমর্যাদা রক্ষার নানা রূপ ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে একটি লেখায় লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের এক কঠোর পরিণতির পূর্বাভাসও।

 

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ