দেশে দাম বৃদ্ধির দিনেই বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২১ সেপ্টেম্বর): দেশের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আসার ঠিক একই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম হ্রাসের তথ্য পাওয়া গেছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরকার দেশের বাজারে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন এবং অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। আর ঠিক একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি আশানুরূপ ও শক্তিশালী থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন ঘটে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের সাপ্লাই চেইন তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১.৬৬ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০২.১৫ ডলারে নেমে আসে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই (ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট) ক্রুডের দাম ১.৮৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি ব্যারেল দাঁড়িয়েছে ৯৮.৪৬ ডলারে।

এদিকে বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা গত ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানান, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে কিছু বিঘ্ন সৃষ্টি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উৎস থেকে তেলের সরবরাহ বাজারের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী রয়েছে।

তাদের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে। তবে এই সরবরাহের পরিমাণ বিগত ২০২৫ সালের দৈনিক গড় উৎপাদনের তুলনায় ৬১ লাখ ব্যারেল কম।

এর মধ্যেই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গত শনিবার এই হামলাগুলো চালানো হয়।

এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলতে থাকা উত্তেজনা ও সংঘাতের বিষয়ে তিনি এখন চূড়ান্ত ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে’ পৌঁছেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, খুব দ্রুতই বড় কোনো ঘটনা ঘটতে পারে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের বর্তমান দর মূলত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর নির্ভর করছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি রপ্তানি স্বাভাবিক হওয়ার গতি মন্থর হলে কিংবা সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে দাম পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশে এখন থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হবে।

এর আগে দেশের বাজারে ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকায় বিক্রি হতো। অর্থাৎ, এক লাফে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই ২০ টাকা করে বৃদ্ধি পেল।

মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে গত মার্চ মাস থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের প্রকৃত মূল্য এবং শিপিং ফ্রেইট বা পরিবহন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকার দেশে সেই অনুপাতে পুরো দাম বাড়ায়নি। এর ফলে গত মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৯ এপ্রিল দেশের বাজারে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। সে সময় কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা, পেট্রলের দাম ১৯ টাকা এবং অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। পরবর্তীতে জুন মাসে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম আরও ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পায়। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের এই দর অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। সূত্র: সিএনবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ