ন্যাটোর বিরুদ্ধে আরও বড় পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২১ সেপ্টেম্বর): রাশিয়া ন্যাটোর বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ইউরোপের বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের মতে, রাশিয়ার এই সম্ভাব্য কর্মকাণ্ডগুলো বছরজুড়ে নয়, বরং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বাস্তবে দেখা যেতে পারে।
তবে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাশিয়ার সরাসরি সামরিক হামলার আশঙ্কার বিষয়ে কিছুটা সংযত ও সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাশিয়া সরাসরি হামলার চেয়ে ইউরোপজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক তৈরি করা হলে, তা প্রকারান্তরে রুশ প্রচারণাই শক্তিশালী করবে।
চেক প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা সংস্থা বিএসআই-এর প্রধান মিখাল কৌদেলকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে জানান, রাশিয়া ন্যাটোর সীমান্তবর্তী কোনো রাষ্ট্রে সীমিত পরিসরে আকস্মিক অনুপ্রবেশ ঘটাতে পারে। এর সাথে সাজানো বা ভুয়া হামলার ঘটনা এবং ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী প্রোপাগান্ডাও যুক্ত থাকতে পারে। তার ধারণা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসের ভেতরেই তৈরি হয়ে যেতে পারে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও সম্প্রতি দেশের পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গোয়েন্দা রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী রাশিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ড্রোন কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ন্যাটোর সীমানায় আঘাত হানার চেষ্টা চালাতে পারে। তার মতে, এর মাধ্যমে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতি বা অনুচ্ছেদগুলো কতটা পোক্ত, তা যাচাই করে দেখতে চায় মস্কো।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ পোলিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সতর্কবার্তাকে বাস্তবভিত্তিক এবং যথার্থ বলে অভিহিত করেছেন। গত শুক্রবার প্যারিসে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান এবং ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেন তিনি। ওই বৈঠকে রাশিয়ার ক্রমশ বাড়তে থাকা হুমকি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অন্যদিকে, লাটভিয়ার নিরাপত্তা পরিষেবার প্রধান নরমুন্দস মেজভিয়েতস জানিয়েছেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে খুব দ্রুতই কোনো বড় ধরনের হামলা চালানোর মতো স্পষ্ট কোনো লক্ষণ তারা এখনো দেখতে পাচ্ছেন না।
তিনি মনে করেন, ইউরোপে রাশিয়া আরও বড় ধরনের কোনো বড় পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে—এমন কিছু আলামত অবশ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এগুলো সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের রূপ নেবে, নাকি ইউরোপীয় সমাজে ভীতি ও সংশয় ছড়িয়ে দেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাসচিব জোনাতান ভেসেভিওভও সম্প্রতি সম্ভাব্য হামলার গুজব ও অতি-আতঙ্কের সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, হামলার পেছনে যদি কোনো বাস্তব বা যৌক্তিক কারণ থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেই তা জনগণকে জানাবে। এর আগ পর্যন্ত সবাইকে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকার আহ্বান জানান তিনি।
লাটভিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজভিয়েতস আরও উল্লেখ করেন যে, রুশ হুমকি মোকাবিলায় পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ। তার ভাষ্যমতে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরুর আগে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো ও পোল্যান্ড বারবার পশ্চিম ইউরোপকে এই বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।
ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার অন্য কর্মকর্তারাও ধারণা করছেন যে, আগামী মাসগুলোতে রাশিয়ার গোপন নাশকতামূলক কার্যক্রম আরও তীব্র হতে পারে। সুইডেনের সামরিক গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান থমাস নিলসন জানিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য কোনো ধরনের অর্থবহ কূটনৈতিক আলোচনায় বসার আন্তরিক সদিচ্ছা মস্কোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
লাটভিয়ার কর্মকর্তা মেজভিয়েতসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপে রাশিয়ার নাশকতার প্রধান লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে—রেলওয়ের বিভিন্ন অবকাঠামো, ইউক্রেনীয়দের সহায়তাকারী নানা স্থাপনা এবং পশ্চিমা প্রতিরক্ষা শিল্প খাত।
সুইডেনের থমাস নিলসনের মতে, এই ধরনের নাশকতামূলক তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য হলো—ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক ও আর্থিক সহায়তা কমিয়ে আনা, ন্যাটোর মিত্রদের মধ্যে অনৈক্য তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।
চেক নিরাপত্তা প্রধান কৌদেলকার ভাষ্য অনুযায়ী, নাশকতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাশিয়া ইউরোপের গোয়েন্দা বিভাগগুলোর ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। বর্তমানে যেকোনো সাধারণ অগ্নিকাণ্ড বা ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনাকেও সম্ভাব্য অন্তর্ঘাত বা সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। এর ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মনোয়ারুল হক/
