হাইকোর্টে বাড়ছে রিট নিষ্পত্তি: বিচারিক শৃঙ্খলায় কমবে মামলার চাপ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৯ সেপ্টেম্বর): সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় তা নিষ্পত্তির হার বেশ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, বিচারিক শৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হলে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা পারস্পরিক বিরোধের রিটগুলো বন্ধ করা গেলে আদালতের ওপর থেকে মামলার এই অতিরিক্ত চাপ আরও বহুলাংশে হ্রাস পাবে।

বর্তমান প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিচারালয়ে একটি যথাযথ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার ব্যবস্থায় এই শৃঙ্খলা বজায় রাখা গেলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত অর্থে সঠিক ন্যায়বিচার পেতে সক্ষম হবে।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের সরবরাহ করা সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সূচনালগ্ন বা বছরের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিটের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। পরবর্তীতে বছরের প্রথম তিন মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময়ে নতুন রিট দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি এবং এই একই মেয়াদে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি রিট মামলা।

এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসের ব্যবধানে নতুন রিট দায়েরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৭২৯টি। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই নির্দিষ্ট সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ, এই প্রান্তিকে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার ছিল প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে জুনের শেষ নাগাদ হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার মোট সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট বিচারাধীন থাকার পেছনের কারণ তুলে ধরে ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, প্রায়শই পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন বা জনস্বার্থ মামলার মোড়কে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে রিট করা হয়, যার নেপথ্যে মূল লক্ষ্য থাকে কেবল আত্মপ্রচার। এমনকি অনেককে রিট দায়েরের পরপরই গণমাধ্যমের সামনে সরব হতে দেখা যায়, যা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়সমূহ হাইকোর্টের জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক। আইনের অনেক দিক ইতোমধ্যে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করে দিলেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো রিট পিটিশন গ্রহণযোগ্য নয় মর্মে সুপ্রিম কোর্টের বহু রায় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চে এসব রিট গ্রহণ করে আদেশ দেওয়া হচ্ছে, যা বিচারিক বিশৃঙ্খলার জন্ম দিচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলার বেড়াজাল ছিন্ন করে শৃঙ্খলার আবহ ফিরিয়ে আনা গেলে রিট মামলার জট অনেকাংশে কমে আসবে।

পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিরোধ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়, যেমন—জমিজমা দখল, সীমানা বিরোধ কিংবা বিল-বাঁওড়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। অথচ আইনি বিধান অনুযায়ী এসব ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিম্ন আদালতে প্রতিকার চাওয়া উচিত। প্রচলিত এই বিচারিক পদ্ধতি বাইপাস করে অনেকেই সরাসরি হাইকোর্টে চলে আসায় মামলার জট অযৌক্তিকভাবে স্ফীত হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক হাইকোর্ট বিভাগে পাঁচ ধরনের রিট মঞ্জুর করার আইনগত এখতিয়ার রয়েছে:

রিট অব হেবিয়াস করপাস: বৈধ কোনো আইনি কারণ বা ভিত্তি ছাড়াই কোনো ব্যক্তিকে আটকে রাখা হলে এই রিটের মাধ্যমে বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে সশরীরে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারেন হাইকোর্ট।

রিট অব ম্যান্ডামাস: সংবিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের যে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তারা তা পালনে ব্যর্থ হলে আদালত তা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন।

রিট অব সার্টিওরারি: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূত বা এখতিয়ারবহির্ভূত কোনো রায় কিংবা আদেশ প্রদান করলে হাইকোর্ট সেই আদেশ বাতিল করতে পারেন।

রিট অব প্রহিবিশন: বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তাদের আইনগত ক্ষমতার পরিধির বাইরে গিয়ে কোনো মামলার কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করলে হাইকোর্ট সেই কার্যক্রম স্থগিত বা বন্ধের নির্দেশ দেন।

রিট অব কো-ওয়ারেন্টো: কোনো ব্যক্তি আইনগত বা সংবিধিবদ্ধ যোগ্যতা ছাড়াই কোনো সরকারি পদে আসীন থাকলে এই রিটের মাধ্যমে তার পদের বৈধতা যাচাই করে থাকে হাইকোর্ট।

বাংলাদেশে মূলত মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমেই জনস্বার্থমূলক রিটের আইনি ভিত্তি ও পথপরিক্রমা উন্মোচিত হয়। এই যুগান্তকারী মামলার রায়েই স্বীকৃতি মিলেছিল যে, জনস্বার্থের অনুকূলে ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও দেশের যেকোনো সচেতন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থের রিট দায়ের করতে পারে। সেই থেকে দেশের জনস্বার্থে করা রিট মামলার পরিধি এক নতুন মাত্রা লাভ করে।

গত কয়েক দশকে হাইকোর্টে দায়ের করা বিভিন্ন জনস্বার্থের রিট মামলার রায়ে অর্জিত হয়েছে অভাবনীয় ও বহুমাত্রিক সাফল্য। এসব রিট মামলার রায়ের সুবাদেই দেশের নদ-নদীগুলো লাভ করেছে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা লিগ্যাল পারসনের স্বীকৃতি।

তাছাড়া হাইকোর্টের বিভিন্ন সময়কার রিটের ঐতিহাসিক রায় ও আদেশের ফলেই নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা কিংবা নির্বিচারে পাহাড় কাটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে। এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে যথাযথ মানবিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় রিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে হাইকোর্টে রিট দায়েরকারী মাত্র একজন ব্যক্তির আইনি লড়াইয়ের সুফল ভোগ করে থাকে দেশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।

সূত্র: বাসস

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ