অর্থপাচার ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থার বিশেষ নজরদারিতে প্রভাবশালীরা
নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৭ সেপ্টেম্বর): দেশের পুঁজিবাজারে অবৈধ অর্থের প্রবেশ ও অর্থপাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
আর্থিক খাতের এই গোয়েন্দা সংস্থার নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে পুঁজিবাজারে লেনদেনকারী প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো বিশেষ নজরদারির আওতায় থাকবে। পাশাপাশি, বেনামী লেনদেন বন্ধ এবং সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করতে ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ পুঁজিবাজারের সব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে আরও কঠোর কমপ্লায়েন্স বা পরিপালন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত মঙ্গলবার বিএফআইইউর পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট সার্কুলার (নম্বর-৩১) জারি করা হয়, যা পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিধান অনুসারে জারিকৃত এই সার্কুলারে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা তৈরি করে তা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।
বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার বা ক্যামলকোর নেতৃত্বে একটি কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট (সিসিইউ) গঠন করা আবশ্যক। একইসঙ্গে শাখা পর্যায়েও শাখা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (বিএএমএলকো) নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কোনো ক্লায়েন্টের অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের তথ্য সংগ্রহ ও তার সত্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কোনো কোম্পানির অন্তত ২০ শতাংশ বা তদূর্ধ্ব শেয়ারের মালিক কিংবা মূল নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের হিসাবের ক্ষেত্রে ‘প্রকৃত সুবিধাভোগী’ বা বেনিফিশিয়ারি ওনার হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বা প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি), স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি (আইপি), আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং অফশোর কাঠামো বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা’ বা ইডিডি গ্রহণের ওপর বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সন্ত্রাসী সত্তার সঙ্গে গ্রাহকদের কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়মিত চেক করার নির্দেশনা রয়েছে।
লেনদেন মনিটরিংয়ের বিষয়ে বিএফআইইউ জানিয়েছে, কোনো লেনদেন যদি অস্বাভাবিক, জটিল কিংবা গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে বলে প্রতীয়মান হয়, তবে শাখা পরিপালন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট বিষয়টি যাচাই করে সত্যতা পেলে ‘গো-এএমএল’ পোর্টালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে বিএফআইইউর কাছে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) পাঠাবে।
মানিলন্ডারিং বিরোধী কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ে নির্ধারিত চেকলিস্ট অনুযায়ী প্রতি অর্ধবছরে (জানুয়ারি-জুন ও জুলাই-ডিসেম্বর) একটি স্ব-মূল্যায়ন বা সেলফ অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে। এই মূল্যায়নের প্রতিবেদন পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে বিএফআইইউতে পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ দিয়েও এই পুরো কার্যক্রম স্বাধীনভাবে যাচাই করাতে হবে।
কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বাপর তথ্য ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের পাশাপাশি কর্মীদের নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণ বা রিফ্রেশার ট্রেনিং দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের যাবতীয় তথ্য ও লেনদেনের দরকারি নথিপত্র অন্তত পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করার বিধান রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএফআইইউর এই কঠোর উদ্যোগ পুঁজিবাজারে অবৈধ অর্থের বিস্তার রোধ করবে এবং সার্বিক আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মনোয়ারুল হক/
