সমাজবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩ সেপ্টেম্বর): সমাজবিরোধী অপশক্তি যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং দেশের বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেউ যাতে নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে দেশবাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে এবং নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করছে। তবে বিভিন্ন সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশেও গণতন্ত্রকামী জনগণের সকল অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতো এক নিষ্ঠুর শাসক জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে কংসরূপী সেই ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে এবার দেশ পুনর্গঠনের পালা।’
একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের বসবাস থাকে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটিই একটি বৈচিত্র্যময় সমাজের প্রকৃত সৌন্দর্য। তিনি বলেন, আজকের অনুষ্ঠানে যারা ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে বিবেচিত, ইউরোপ বা আমেরিকায় গেলে আমরা সবাই কথিত সংখ্যালঘুতে পরিণত হই। তাই বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয়কে মুখ্য বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আসুন সবাই নিজেদের বাংলাদেশি হিসেবে ভাবি।’ রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য তৈরির কারণ না হয়, সেই উপলব্ধি থেকেই দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে স্বাধীনতার ঘোষকের যুগান্তকারী রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সকল নাগরিকের গর্বিত পরিচয়—আমরা বাংলাদেশি।’
বর্তমান সরকার একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র তার সামর্থ্য ও সক্ষমতা অনুযায়ী দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। অন্যদিকে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের সব নাগরিক দায়িত্ব পালন করবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, আস্থা এবং আলোচনার মাধ্যমেই সকলের কাঙ্ক্ষিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। দেশের এই রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি। এজন্য সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
সনাতন ধর্মের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সনাতন ধর্মের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, যখন সেখানে নিষ্ঠুর, দুষ্টপ্রকৃতির, অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী শাসক ‘কংস’-এর শাসন চলছিল।
তিনি বলেন, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।
হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার, আমার ও আমাদের সকলের অধিকার সমান। নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার।’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার এবং বিএনপি বিশ্বাস করে—‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’
‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শুভ জন্মাষ্টমীর উৎসবের পরই সামনে আসছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব দুর্গাপূজা। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, হিন্দু সম্প্রদায় শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশে সব উৎসব ও আয়োজন পালন করবে।
জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে আসন্ন দুর্গোৎসবেরও আগাম শুভেচ্ছা জানান।
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে শুভেচ্ছা বিনিময়ের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গীতা পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
এর আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে প্রধানমন্ত্রীও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে পুষ্পস্তবক উপহার দেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে পুষ্পস্তবক গ্রহণ করেন সংসদ সদস্য সুবর্ণা শিকদার ঠাকুর।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন মন্দিরের নয়জন পুরোহিত ও সেবাইতের মধ্যে সম্মানী বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সময়ে সারাদেশের পুরোহিত ও সেবাইতদের ব্যাংক হিসাবে এফটিএ’র মাধ্যমে সম্মানীর অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়।
হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মদিন শুক্রবার। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এই শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন, সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন চন্দ্র মজুমদার, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও কালবেলা পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, স্বামীবাগ ইসকনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ এবং বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু বক্তব্য রাখেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ফরহাদ হালিম ডোনার, সহ-সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরীসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মনোয়ারুল হক/
