রূপপুর প্রকল্পে ‘বালিশ-কাণ্ডের’ পর এবার ২১৪ কোটির বিদ্যুৎ সরঞ্জাম কেলেঙ্কারি

নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩০ জুন) : রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’তে বালিশ ও আসবাবপত্র কেনার নামে অতীতে হওয়া দুর্নীতির রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় এক বিশাল পুকুরচুরির ঘটনা ফাঁস হয়েছে।

আবাসন এলাকার ১১টি ভবনে সাবস্টেশন সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়ে সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি অর্থ পরিশোধের প্রমাণ পেয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়। যেখানে সরকারি হিসাবে যন্ত্রাংশগুলোর প্রকৃত দাম ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা, সেখানে ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, কৌশলে সরকারের পকেট থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।

কৌশলী কারসাজি ও ভবনে ভবনে হরিলুট

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক অভিনব জালিয়াতির চিত্র। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রের মোট মূল্য প্রাক্কলিত দরের কাছাকাছি রাখতে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মূল বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও জেনারেটরের দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। যেমন—একটি ভবনের উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি দর মাত্র ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা হলেও বিল তোলা হয়েছে সাড়ে ৪ কোটি টাকা। একইভাবে ৪০ লাখ টাকার ট্রান্সফরমারে ৪ কোটি ৪০ লাখ এবং ১০ লাখ টাকার প্যানেলে ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, কেবল একটি ভবন থেকেই অতিরিক্ত ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা লুটে নিয়েছে চক্রটি।

তিন ঠিকাদারের পকেটে ১৮৭ কোটি টাকা

নথি অনুযায়ী, এই বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ ভাগাভাগি করে নিয়েছে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান:

  • মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: ১২ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে তুলে নিয়েছে ৯২ কোটি টাকা।
  • সাজিন এন্টারপ্রাইজ: ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকার মালামাল সরবরাহ করে পকেটে পুরেছে সাড়ে ৮২ কোটি টাকা।
  • এমএসসিএল-জিকেবিপিএল (যৌথ উদ্যোগ): ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকার উপকরণের বিপরীতে হাতিয়েছে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

নিয়মকে বুড়ো আঙুল ও জড়িতদের ফিরিস্তি

সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী অস্বাভাবিক দামের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা চাওয়ার নিয়ম থাকলেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি অনুমোদিত প্রাক্কলন কমিটি গঠনের কোনো প্রমাণও মেলেনি। এই হরিলুটের পেছনে তৎকালীন রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান এবং পাবনা গণপূর্তের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলমসহ (যাঁকে ২০১৯ সালে আসবাবপত্র দুর্নীতিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে।

টিআইবি’র উদ্বেগ ও সিএজির সুপারিশ

এই ঘটনাকে একটি ‘মেগা দুর্নীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মেগা প্রকল্পগুলোতে সুশাসনের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই এমন আর্থিক লুটপাট সম্ভব হচ্ছে। চলমান অন্য মেগা প্রকল্পগুলোর সুরক্ষার্থেই এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।

সিএজি কার্যালয় ইতিমধ্যেই এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও পুঞ্জীভূত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি লোপাট হওয়া ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার জোরালো সুপারিশ করেছে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ