হামের প্রাদুর্ভাব: বাড়ছে আতঙ্ক, জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু
বিশেষ প্রতিনিধি, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৪ এপ্রিল) : দেশজুড়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে হাম। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা, আর বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে প্রায় এক হাজার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে কয়েক ডজনের ক্ষেত্রে। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার শিশু একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে হাম নিশ্চিত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—স্বল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়া। গত কয়েক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে প্রায় একশ শিশুর কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ার মতো সমস্যা তৈরি হওয়ায় মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, যা প্রথমে বেশি আক্রান্ত উপজেলাগুলোতে চালু হবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের টিকার আওতায় আনা এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো।
কাল রবিবার থেকে হামের জরুরি টিকাদান (ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশন) কার্যক্রম শুরু করছে সরকার। দেশের যেসব উপজেলায় শিশুরা হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, প্রথমে ওইসব উপজেলা থেকে এই টিকা কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তিনি বলেন, যতটা ভয়াবহভাবে হাম আমাদের আক্রমণ করেছে, আমরা তার চেয়ে দ্রুতগতিতে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালটি হয়েছে। ‘আমরা ইমারজেন্সি ভ্যাকসিনেশনের কাজ রবিবার থেকে শুরু করব। আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সব ছুটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। কোনো ছুটি থাকবে না। ভ্যাকসিন যারা দেবে, তারা সবাই আন্ডার সুপারভিশন অব লোকাল অফিসার থাকবে এবং কাজ করবে।’
দেশজুড়ে হামের প্রকোপের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, ‘শিশুদের মাঝে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় আপৎকালীন নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা ও হামের ভ্যাকসিন দেওয়ার সুবিধার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও অধিদপ্তরাধীন সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সর্বস্তরের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি (অর্জিত ছুটি ও নৈমিত্তিক ছুটি) স্থগিত/বাতিল করা হলো। এ আদেশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে জারি করা হলো এবং অবিলম্বে কার্যকরী হবে।’
হামের টিকা কর্মসূচি সফল করতে স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য সহকারী, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, পোর্টারসহ বিভিন্ন পদে কর্মরতদের প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ সময় তাদের বিভিন্ন দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সভায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষ থেকে আসা প্রতিনিধিরা চাকরিতে তাদের দীর্ঘদিনের সমস্যা ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। বহু বছর ধরে তাদের বেতন গ্রেড উন্নয়নের দাবি বাস্তবায়ন ঝুলে আছে। তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে কাজ করুন। সরকারকে সহযোগিতা করুন। আপনাদের ন্যায্য দাবি পূরণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজেই দাবিদাওয়ার বিষয়গুলো আসন্ন জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি থেকে আলাদা থাকাই ভালো।’ সভায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যায্য দাবি পূরণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হানকে সভাপতি করে একটি কমিটি করে দেওয়া হয়। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান নিশ্চিত করা, পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তারা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন, শিশুদের মধ্যে জ্বর, র্যাশ বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে হামের এই বাড়তি ঝুঁকি মোকাবিলা করতে এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
মনোয়ারুল হক/
