স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নারী আসনে মনোনয়নসহ চার ইস্যুতে সিদ্ধান্ত আসতে পারে
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৪ এপ্রিল) : বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পর দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
আজ শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে তিনি এই বৈঠক ডেকেছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই হতে যাচ্ছে স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক। জানা গেছে, আজকের বৈঠকে দল পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড জোরদার, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ চারটি ইস্যুতে আলোচনা ও নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এর আগে সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারি দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছিল বলে জানান বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ বৈঠকে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক অবস্থাসহ চারটি বড় ইস্যু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। এগুলো হচ্ছে—১. সংগঠন পুনর্গঠন করা। অর্থাৎ বিএনপির অঙ্গসহযোগী সংগঠনসহ সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করে দলকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার বিষয়ে নতুন রোডম্যাপ তৈরি হতে পারে। ২. সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন তথা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে দলের অবস্থান ও করণীয় নির্ধারণ করা হতে পারে আজকের বৈঠকে। ৩. নেতাদের দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি। অর্থাৎ নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে বিএনপির সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা আসতে পারে। ৪. সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ তথা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণ এবং মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির আজকের বৈঠককে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির রাজনৈতিক কৌশল কোন দিকে যাবে, তার একটি স্পষ্ট আভাস এ বৈঠক থেকে পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং স্থবির হয়ে পড়া সাংগঠনিক ইউনিটগুলোকে চাঙ্গা করাই বর্তমানে হাই কমান্ডের মূল চ্যালেঞ্জ।
বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, তিন মাস পর এ বৈঠক হওয়ায় দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে। দলের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জনসম্পৃক্ত কর্মকাণ্ড এবং উদ্যোগ কীভাবে এগিয়ে নেওয়া ও অব্যাহত রাখা যায়, তারও রূপরেখা আসতে পারে আজকের এ বৈঠক থেকে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততা ছিল। সরকার গঠনের পরও ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে প্রায় তিন মাস পর দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হবে এদিক থেকে বৈঠকটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।’ বৈঠকের আলোচ্য বিষয় কী থাকছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যেহেতু আমাদের স্থায়ী কমিটির বৈঠক নিঃসন্দেহে সেখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনা হবে। এটা দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, কমিটি গঠন সবকিছুই আমরা আলোচনা করব।’
বৈঠকে মূল এজেন্ডায় যা থাকতে পারে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তারিখ ও তপশিল নির্ধারণে আগামী ৬ এপ্রিল সোমবার সভায় বসছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ওই দিনই নির্বাচনের বিস্তারিত সময়সূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে কমিশন সূত্র জানিয়েছে। কেননা, সংরক্ষিত আসনের হিসাব-নিকাষ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো এরই মধ্যে কমিশনকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও চিঠি দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, আগামী ৬ এপ্রিল আমরা কমিশন সভা ডেকেছি। ওই সভায় সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তপশিল ও ভোটের তারিখ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তিনি আরও জানান, পার্লামেন্ট থেকে দলগুলোর হিসাব চলে এসেছে। এখন আমরা শিডিউল দিলেই দলগুলো তাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেবে। সে অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসাররা বাকি কাজ করবেন।
জানা গেছে, এবার সংরক্ষিত নারী আসনে মহিলা দলের ত্যাগী নেত্রী ও অপেক্ষাকৃত তরুণদের জায়গা দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। তাদের সঙ্গে কয়েকজন প্রবীণ নেত্রীও জায়গা পাবেন। কেননা, ২০০১ সালে যারা সংক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন, তাদের অনেকে বয়সের কারণে রাজনীতি থেকে বিদায় নিয়েছেন। কেউ কেউ এখনো রাজনীতির মাঠে আছেন। তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ এবারও জায়গা করে নিতে পারেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯৭ আসনের ফল গেজেট আকারে ঘোষণা করা হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি। বাকি আসনগুলোয় বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থিরা জয় পেয়েছেন। এবারের নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে প্রায় ১৫০ জন কখনো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং বিকেলে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন।
জানা যায়, অবশ্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটের পরিসংখ্যান মতে- বিএনপি জোটের ভাগে ৩৫-৩৬টি আসন পড়তে পারে। তবে অন্তত শতাধিক নারী নেত্রী বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। এসব আসনে মনোনয়ন পেতে ইতিমধ্যে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেত্রীরা। যাদের বেশিরভাগই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী।
এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিলসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন এবং হালনাগাদের বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। কেননা, দীর্ঘদিন পর সরকার গঠন করে যেন ফুরফুরে মেজাজে বিএনপি। তবে নানা কারণে দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনেকটাই ভাটা পড়েছে। মূল দল বিএনপির কাউন্সিল হয়নি ৯ বছরের বেশি সময় ধরে। প্রায় সব অঙ্গসহযোগী সংগঠনের কমিটির মেয়াদও শেষ। বিএনপি এবং কয়েকটি সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছেন। সংগঠনের পেছনে তারা সময় দেওয়ার ফুরসত খুব একটা পাচ্ছেন না। সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। এতে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাদের সময় ও মনোযোগ কমেছে। ফলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে পদপ্রত্যাশী এবং পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। খুব দ্রুত সংগঠন না গোছালে সাংগঠনিক সংকটে পড়তে পারে বিএনপি।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা বলছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় সবসময় থাকত কোলাহলপূর্ণ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আনাগোনা, সংবাদ সম্মেলন, মিছিলের প্রস্তুতি ও দলীয় কৌশল নির্ধারণে সরগরম থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু সেই চিত্র এখন আর দেখা যায় না। এখন অনেক সময়ই কেন্দ্রীয় কার্যালয় তুলনামূলক শান্ত ও ফাঁকা দেখা যায়। শুধু তাই নয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় ও সরকার গঠনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছে ধীর গতিতে। এমনকি নির্বাচনের পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচিও আগের তুলনায় কমে গেছে। ফলে কেন্দ্রীয় নেতাদের দলীয় কার্যালয়ে উপস্থিতির বিষয়টি দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গুরুত্ব পাবে।
জানা যায়, ৯ বছরেও হয়নি বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্মেলন। সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। তা ছাড়া বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের প্রধান রসদ জোগানদাতা দুটি সহযোগী ও ৯টি অঙ্গসংগঠনের সাংগঠনিক অবস্থাও যেন বেহাল। ছাত্রদলের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ছয় সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি দিয়ে দুই বছর ধরে চলছে যুবদল। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি নেই প্রায় ১৩ বছর ধরে। গ্রুপিং-কোন্দলে বিপর্যস্ত জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)। দেড় বছরের বেশি সময় কেন্দ্রীয় কমিটি নেই জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের। মেয়াদহীন কমিটি দিয়ে চলছে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছসেবক দল, মহিলা দল, তাঁতী দল এবং কৃষক দল। এসব গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের কার্যকর কমিটি না থাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সাংগঠনিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এসব সংগঠনের নতুন কমিটি গঠনের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। মূলত ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুরোদমে দল পুনর্গঠন শুরু করে বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে আগে ও পরে সবার ব্যস্ততা থাকলেও আমাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। প্রায় তিন মাস পর স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নানা এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে দলের সাংগঠনিক কাজে জোর দেওয়া হতে পারে। মূল দলের কেন্দ্রীয় কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। দলের কাউন্সিল হয় না কয়েক বছর। দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কয়েক বছর ধরে অনেক জেলায় নতুন কমিটি নেই। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া নির্বাচনের পর সরকারের প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। কেননা, বৈঠকের এজেন্ডা কাউকে পাঠানো হয় না।’
মনোয়ারুল হক/
