হোম অফিসের নোটিশ, মেটা থেকে চাকরি হারাচ্ছেন ৮ হাজার কর্মী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, (২০ মে) : সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মীদের কাছে নির্দেশ এসেছিল—আজ অফিসে আসার প্রয়োজন নেই, সবাই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করবেন। কোনো টাউনহল মিটিং হয়নি, অফিসজুড়ে ছিল না কোনো দৃশ্যমান উদ্বেগও। এরপরই একে একে কর্মীদের ইনবক্সে পৌঁছাতে শুরু করে ইমেল- মেটা প্ল্যাটফর্মস শুরু করেছে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই।

আর এই স্বাভাবিক নির্দেশের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক বড় ধাক্কা। কিছুক্ষণের মধ্যেই কর্মীদের ইনবক্সে আসতে শুরু করে চাকরিচ্যুতির ইমেইল। এভাবেই এক অভিনব ও নাটকীয় উপায়ে প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ কর্মী ছাঁটাইয়ের ফলে চাকরি হারাচ্ছেন মেটার মোট জনশক্তির প্রায় ১০ শতাংশ।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় ভোর ৪টায় কর্মীরা ছাঁটাইয়ের ইমেল পান। টাইম জোন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পাঠানো হয় এসব নোটিফিকেশন। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল নীরব- প্রথমে বাড়ি থেকে কাজের নির্দেশ, তারপর ছাঁটাই।

মেটার এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রিক পুনর্গঠন। ছাঁটাইয়ের আগে কোম্পানিটিতে কর্মী ছিলেন প্রায় ৭৮ হাজার। এখন হাজারো কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, আবার অনেককে নতুন দলে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

এক অভ্যন্তরীণ মেমোতে মেটার চিফ পিপল অফিসার জ্যানেল গেইল জানান, প্রায় সাত হাজার কর্মীকে এআই-ভিত্তিক নতুন টিমে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার শূন্য পদ বাতিল করা হয়েছে এবং ব্যবস্থাপনার স্তর কমানো হচ্ছে। তার ভাষায়, ছোট ও দ্রুতগতির টিম গঠন করাই এখন কোম্পানির লক্ষ্য, যাতে কর্মীরা নিজেদের কাজের ওপর আরও বেশি মালিকানা অনুভব করতে পারেন।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোডাক্ট টিমে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ইতোমধ্যে এআইকে কোম্পানির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

মেটা জানিয়েছে, তারা এ বছর এআই খাতে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।

তবে কর্মী ছাঁটাইয়ের এই প্রক্রিয়া মেটার ভেতরে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে। তথ্য ফাঁসের পর থেকেই কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ে।

জানা যায়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই অনেক কর্মী অফিস থেকে বিনামূল্যের খাবার ও অতিরিক্ত ল্যাপটপ চার্জার সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন।

একই সময়ে আরও একটি বিতর্ক সামনে আসে। অভিযোগ ওঠে, একটি নতুন অভ্যন্তরীণ টুলের মাধ্যমে কর্মীদের মাউসের নড়াচড়া ও কিস্ট্রোক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে এআই সিস্টেমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক হাজারের বেশি কর্মী একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করেন।

অনেক কর্মীর ধারণা, বাড়ি থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরো ছাঁটাই প্রক্রিয়াটি নিঃশব্দে সম্পন্ন করা- যাতে অফিসে কোনো বিশৃঙ্খলা, প্রতিবাদ বা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

তবে এটি শুধু মেটার গল্প নয়। প্রযুক্তি খাতজুড়ে এখন একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সিসকে সিস্টেমস চার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এছাড়া মাইক্রোসফট, আমাজোন, ডিজনি ও এএসএমএল কর্মী ছাঁটাই বা স্বেচ্ছায় অবসরের ঘোষণা দিয়েছে। এপ্রিল মাসে ওরাকল-ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজারো কর্মীকে ভোরে ইমেইলের মাধ্যমে ছাঁটাই করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাময়িক সংকট নয়; বরং প্রযুক্তিশিল্পে একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। রেডোকের প্রধান নির্বাহী দীপল দত্তের ভাষায়, জেনারেটিভ এআই এবং স্বয়ংক্রিয় এজেন্টভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, গ্রাহকসেবা ও ডেটা ব্যবস্থাপনার মতো অনেক প্রচলিত কাজকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। ফলে কর্মীসংখ্যা বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনের পুরোনো মডেল এখন ভেঙে পড়ছে।

তার মতে, ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি পেশাজীবীদের শুধু কোড লেখায় দক্ষ হলেই হবে না; বরং জটিল এআইভিত্তিক সিস্টেম ডিজাইন ও পরিচালনার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। কারণ, আগামী দিনের প্রযুক্তি দুনিয়ায় সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠবেন তারাই, যারা এআই-চালিত অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার সমন্বয় ঘটাতে পারবেন। সূত্র: এনডিটিভি

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ