নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে: আনফ্রেল
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (১৫ ফেব্রুয়ারি) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন (আনফ্রেল)।
সংস্থাটি বলেছে, অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোটগ্রহণ ও গণনা সম্পন্ন হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিল। ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে কিছু সুপারিশও দিয়েছে আন্তর্জাতিক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা।
রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত নির্বাচন-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান আনফ্রেলের চেয়ারপারসন রোহানা হেতিয়ারাসসি।
সংবাদ সম্মেলনে আনফ্রেল জানায়, দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত এই জাতীয় নির্বাচন জনগণের আগ্রহ ও অংশগ্রহণের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটাররা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরেছেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা খুব সীমিত ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
রোহানা হেতিয়ারাসসি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর এ নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল, যা ভোটকেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি থেকেই বোঝা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।’ দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে
আনফ্রেল পর্যবেক্ষক দল জানায়, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অধিকাংশ এলাকায় ভোটাররা নিরাপদে ভোট দিতে পেরেছেন। কোথাও কোথাও অনিয়ম বা প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ পাওয়া গেলেও তা সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেনি বলে জানায় সংস্থাটির পর্যবেক্ষক দল।
তবে কিছু কেন্দ্রে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত জটিলতা, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের ঘাটতি এবং গণনা প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার অভাবের কথা উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আরও মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রচার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।
আনফ্রেল চেয়ারপারসন বলেন, ‘নির্বাচনি প্রচারণার ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল বিবরণী প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল ভোটের দিন নয়, পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। অর্থায়নের উৎস ও ব্যয়ের খাত প্রকাশ করা হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।’
আনফ্রেল মনে করে, তরুণ ও নারী ভোটারদের সক্রিয় ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তাদের প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচনি ইশতেহার ও সাংগঠনিক কাঠামোয় তরুণ ও নারীদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করা।
রোহানা হেতিয়ারাসসি বলেন, ‘গণতন্ত্র তখনই পরিপূর্ণ হয়, যখন সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। তরুণ ও নারী ভোটারদের সম্পৃক্ততা শুধু ভোটদানে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও বাড়াতে হবে।’
ভোট গণনা প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতার আহ্বান
আনফ্রেল পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ভোট গণনা প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার সুপারিশ করা হয়েছে। গণনা শেষে ফলাফল প্রকাশে সময়ক্ষেপণ, তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয়হীনতা কিংবা পর্যবেক্ষকদের সীমিত প্রবেশাধিকার-এসব বিষয়ে উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
সংস্থাটি মনে করে, ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলোতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, প্রশিক্ষিত নির্বাচনকর্মী নিয়োগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে আস্থা আরও বাড়বে।
সব মিলিয়ে আনফ্রেল বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক অনুশীলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ভোটারদের আগ্রহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনামূলক স্থিতিশীলতা-এসব দিক নির্বাচনকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়ার উন্নয়ন-এসব ক্ষেত্রে আরও অগ্রগতি প্রয়োজন বলেও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেছে আনফ্রেল।
মনোয়ারুল হক/
