জাপানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়তে প্রধানমন্ত্রীর সফর গুরুত্বপূর্ণ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২৬ অক্টোবর): জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান টোকিও সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের প্রথম দিনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক ও কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের ইতিবাচক আগ্রহ রয়েছে। জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা, বাণিজ্য খাতের পরিধি বাড়ানো এবং বড় পরিসরে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

সফরের প্রথম দিনের কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে টোকিওতে পৌঁছে একটুও বিশ্রাম নেননি প্রধানমন্ত্রী। বরং দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ নিশ্চিত করতে তিনি সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এরপর সামান্য হালকা খাবার গ্রহণ করেই তিনি পূর্বনির্ধারিত ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মস্পৃহা এবং দেশের স্বার্থকে যেকোনো কিছুতে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা সফরের শুরুতেই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই দুই দেশের মধ্যে একটি গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরও এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বের সেই সুদৃঢ় ভিত্তিকে আরও এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

সফরের প্রথম দিনের বৈঠকে অর্জিত সাফল্যের কথা উল্লেখ করে হুমায়ুন কবীর জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলে দেশটির লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) জ্যেষ্ঠ নেতারাসহ অন্যান্য বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, জাপানি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।

তারো আসোর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নে তারো আসোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে বাংলাদেশে একটি বিনিয়োগবান্ধব ও সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে তার এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।

জাপানি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সফরের প্রথম দিনেই মারুবেনি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের সভাপতি মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। ওই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে সদ্য স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের বর্তমান অগ্রগতি এবং বাংলাদেশে নতুন জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

তিনি আরও জানান, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি খাত, উন্নত উৎপাদন শিল্প, সার উৎপাদন এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা আধুনিকায়নের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোতে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় সার কারখানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সম্ভাবনা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগের নতুন সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জাইকার সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপানের সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত ও নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কৃষির আধুনিকীকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে জাপানি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনার কথা বৈঠকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে জাপানের আরও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন। জবাবে জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের চলমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাব অব্যাহত রাখার জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে উল্লেখ করে হুমায়ুন কবীর বলেন, নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে আয়োজিত এক বিশেষ নৈশভোজেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে বাংলাদেশ সফর করা সাসাকাওয়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফল সফরের মাধ্যমে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি উভয় স্তরের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কর্মসূচি রয়েছে। এসব বহুমুখী উদ্যোগের ফলস্বরূপ বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে। পারস্পরিক আস্থা, পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। দেশের বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান গন্তব্যে পরিণত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং দুই দেশের সাধারণ মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক দুয়ার উন্মোচিত হবে বলে সরকার দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমান, উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমসহ সরকারের পদস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ