সর্বজনীন পেনশনে আসছে বড় পরিবর্তন, মিলবে ঋণ-স্বাস্থ্যবিমা
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (১৬ সেপ্টেম্বর): সাধারণ মানুষের মাঝে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও ফলপ্রসূ করতে নতুন কিছু সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আওতায় পেনশনারের মৃত্যুর পর তার জীবনসঙ্গীকে আজীবন পেনশন প্রদান, স্বাস্থ্যবিমার সুরক্ষা, বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ পাওয়ার সুবিধা এবং বিশেষ শর্তে এই স্কিম থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পদাধিকারবলে অর্থমন্ত্রী এই পর্ষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। আজকের এই সভায় প্রস্তাবিত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মোড়. সুরাতুজ্জামান জানিয়েছেন, জনসাধারণের অংশগ্রহণ বাড়াতে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব পর্ষদে পেশ করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন সাপেক্ষে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই এসব সুবিধাগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাসের কারণে নির্ভরশীলতা বাড়ার ঝুঁকি রোধ করতে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে এই সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছিল। তবে প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ ব্যাংক আমানতের তুলনায় পেনশনের মুনাফা কিছুটা কম হওয়া এবং গ্রাহকদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো বড় সুবিধা না থাকায় মানুষের ঝোঁক কম রয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন নাগরিক নিবন্ধিত হয়েছেন, যেখানে মোট জমাকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়াতে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এর মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত বা দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের জন্য নির্ধারিত ‘সমতা’ স্কিমে সবচেয়ে বেশি ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধিত হয়েছেন এবং জমা হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, প্রবাসীদের জন্য প্রণীত ‘প্রবাস’ স্কিমে সাড়া সবচেয়ে কম; মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন (যার মধ্যে নারী মাত্র ৯৭ জন) এতে নাম লিখিয়েছেন এবং জমা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
স্বামী বা স্ত্রী পাবেন আজীবন পেনশন
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, একজন গ্রাহক ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর মাসিক পেনশন উত্তোলন শুরু করেন। এই পেনশনের ভোগকালীন সময়ে যদি তার মৃত্যু হয়, তবে নমিনি হিসেবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি পেনশনারের বয়স ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত একই হারে পেনশন পেয়ে থাকেন।
নতুন প্রস্তাবে নমিনির এই নিয়মে পরিবর্তন এনে পেনশনারের অবর্তমানে তার স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মূলত সরকারি চাকরিজীবীদের প্রচলিত পেনশন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, পেনশন বয়সসীমা ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছরে নামিয়ে আনার বিষয়টিও আজকের পর্ষদ সভায় আলোচনার টেবিলে থাকতে পারে।
চালু হচ্ছে ঋণ গ্রহণের সুযোগ
আইনে গ্রাহকদের জমানো অর্থের একটি অংশ বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ হিসেবে নেওয়ার বিধান রাখা হলেও এতদিন তা কার্যকর ছিল না। এবার সেই প্রক্রিয়াটি চালুর জোর প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গ্রাহক তার নিজ জমানো তহবিলের একটি অংশ বিশেষ প্রয়োজনে লোন হিসেবে তুলতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ঋণের বিপরীতে যে মুনাফা বা সুদ অর্জিত হবে, তাও গ্রাহকের নিজস্ব পেনশন অ্যাকাউন্টেই জমা হবে।
শারীরিক অক্ষমতায় সম্পূর্ণ অর্থ তোলার সুযোগ
নতুন সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক টানা পাঁচ বছর নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার পর যদি শারীরিক বা আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে তাকে বিশেষ বিবেচনায় স্কিম থেকে বের হয়ে জমানো পুরো অর্থ এককালীন তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়মটি চালু হলে দীর্ঘমেয়াদি এই স্কিমে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা ও ভীতি অনেকাংশেই দূর হবে।
নামমাত্র খরচে স্বাস্থ্যবিমা
পেনশনভোগীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তাদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এসংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই মডেলে গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসিক মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে স্বাস্থ্যবিমা নিশ্চিত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিমের ভাবনা
ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তুলতে একটি আলাদা শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, আজকের পর্ষদ সভায় এসব জনকল্যাণমুখী প্রস্তাবগুলো অনুমোদিত হলে এবং দ্রুত বিধিমালা সংশোধন করা গেলে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
মনোয়ারুল হক/
