আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

নিউজ ডেস্ক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (৩০ জুলাই) : বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চলমান বিচারকার্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

নিউইয়র্কভিত্তিক এই সংস্থার মতে, বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়ায় নানা ধরনের আইনি ত্রুটি ও অনিয়ম থাকায় প্রকৃত ভুক্তভোগীরা যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তেমনি দেশে আইনের শাসনও বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি, এর ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে অন্যায্য কারাবন্দিত্ব এবং অতীতে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি এই আশঙ্কার কথা জানায়।

গত ২৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার গুরুতর অভিযোগে রাজনীতিবিদ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিকসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেয় প্রসিকিউশন পক্ষ। দীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে এই ট্রাইব্যুনালে। স্মরণীয় যে, ওই আন্দোলনের মুখে আগস্টে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটেছিল এবং ছাত্র-জনতার সেই তীব্র দমনপীড়নে আট শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ও হাজার হাজার মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, অতীতের সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হলেও, বর্তমানের অনেক বিচারিক কার্যক্রমই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুষ্ঠু বিচারের ন্যূনতম মাপকাঠি অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কাঠামোগত জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসনের উচিত নিশ্চিত করা যেন যেকোনো ধরনের ইচ্ছামাফিক অভিযোগ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ একেবারে বন্ধ থাকে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনালের আইনে কিছু সংশোধনী আনলেও, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলেও এ বিষয়ে আর কোনো নতুন সংস্কার আনা হয়নি বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

সংস্থাটি জানায়, তারা ট্রাইব্যুনালের এক ডজনেরও বেশি মামলার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রসিকিউটরদের হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং আটক ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় ধরে লিখিত কারণ ছাড়াই আটকে রাখা যায়। তা ছাড়া, আলাদা আদালতে অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের সুযোগ না থাকা, প্রমাণ প্রকাশের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে বিচার শুরু করা—যা আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নিতান্তই অপ্রতুল—এবং অনুপস্থিতিতে বিচারে অভিযুক্তের নিজস্ব আইনজীবী বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকার মতো বিষয়গুলো আইনি সুরক্ষাকে চরমভাবে খর্ব করছে।

গত ১৪ মে হেফাজতে ইসলামের ২০১৩ সালের একটি সমাবেশ ঘিরে সংবাদ পরিবেশনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রসিকিউশন পক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রচার করে হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার সহায়তার অভিযোগ আনলেও, আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী গ্রেপ্তারের সময় তাঁদের কোনো লিখিত কারণ বা নোটিশ দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পরবর্তীতে ২৭ জুলাই এই দুই সাংবাদিককে ৪১ জনের ওই মূল অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তদন্ত প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এইচআরডব্লিউ অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রস্তুতকৃত একাধিক জবানবন্দির বিভিন্ন অনুচ্ছেদে হুবহু একই রকম ভাষা ও বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কথা তুলে ধরা হয়, যেখানে ৫৫টি জবানবন্দির একটি বড় অংশে একাধিক অনুচ্ছেদ ও বাক্য সম্পূর্ণ মিল রয়েছে। এ ছাড়া, এই একই মামলায় কারাবন্দী জ্যেষ্ঠ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীদের ফাঁস করা একটি অডিও রেকর্ডে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে জামিন পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। যদিও ওই প্রসিকিউটর পরে পদত্যাগ করেন, তবে প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই বিচারকেরা অভিযোগ গঠন করে আগামী ৬ আগস্ট মামলার বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

পরিশেষে মীনাক্ষী গাঙ্গুলি সতর্ক করে বলেছেন যে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পুরোনো পথ ও ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। একই ধরনের ও কপিপেস্ট করা জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ গঠন কখনো একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারব্যবস্থার মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারে না। বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়া বজায় থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আবারও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

মনোয়ারুল হক/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
ব্রেকিং নিউজ