রাজশাহীতে দ্রুত ছড়াচ্ছে হাম, শনাক্তের হার ২৯ শতাংশ
নিজস্ব প্রতিবেদক (রাজশাহী), এবিসিনিউজবিডি, (২৯ মার্চ) : রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগ হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য হারে এই রোগ শনাক্ত হচ্ছে। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইসোলেশনব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধার অভাবে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু ভর্তি বাড়তে থাকে। ১৮ মার্চ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিভাগের সাতটি সদর হাসপাতাল ও চারটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ১৫৩টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠায়। এর মধ্যে ৪৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে, যা প্রায় ২৯ শতাংশ শনাক্তের হার নির্দেশ করে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, কথা বলা কিংবা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সংক্রামক রোগীদের আলাদা আইসোলেশনব্যবস্থায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের অন্য রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মার্চের শুরু থেকে এ পর্যন্ত গুরুতর অসুস্থ অন্তত ৮৪ শিশুকে সাধারণ ওয়ার্ড থেকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু সীমিত শয্যার কারণে অনেকেই আইসিইউ সুবিধা পাচ্ছেন না। বর্তমানে রামেক হাসপাতালের শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা রয়েছে মাত্র ১২টি, যা রোগীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার চার শিশুকে আইসিইউতে ভর্তির সুপারিশ করা হয়। এরা হলো দুর্গাপুরের জান্নাতুল মাওয়া (৮ মাস), চাঁপাইনবাবগঞ্জের হুমায়রা (৭ মাস), শ্রীরামপুরের ফারহানা (৯ মাস) এবং কুষ্টিয়ার হিয়া (৭ মাস)। এর মধ্যে শুক্রবার সকালেই হুমায়রা ও ফারহানার মৃত্যু হয়েছে। অন্য দুই শিশুকে এখনো সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশুদের স্বজনরা জানিয়েছেন, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জান্নাতুল মাওয়ার নানি ফরিদা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাটা খুব অসুস্থ, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করছি।’ একইভাবে হিয়ার বাবা রিফাত তার সন্তানের সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শুক্রবার হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, একাধিক শিশুকে একই বেডে বা কাছাকাছি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং একই স্থানে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিশুর ক্যানোলা করা হচ্ছে। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হলো মৃত্যুর কারণ উল্লেখ অস্পষ্টতা। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদে ‘হাম’ উল্লেখ না করে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা লেখা হচ্ছে। এতে রোগটির প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে, যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আড়াই মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু সনদে ‘হাম’ উল্লেখ পাওয়া গেছে।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিন জানান, হাসপাতালের দুটি আইসোলেশন ওয়ার্ড থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নেই। এ ছাড়া ২০০ শয্যার বিপরীতে ঈদের আগে ৭০০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ওয়ার্ডেই রোগীদের আলাদা করে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে রাজশাহীর বেসরকারি বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেলাল উদ্দিন জানান, এক দিনে ভর্তি হওয়া ৭৫ শিশুর মধ্যে ৬০ জনের মধ্যেই হামের লক্ষণ পাওয়া গেছে। আগের দিন ভর্তি হওয়া ২৮ শিশুর মধ্যে ২০ জনের একই উপসর্গ ছিল। পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব না হওয়ায় তাদের একসঙ্গেই রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসায় অনেক শিশু সুস্থ হয়ে উঠছে।
রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলাতেই বর্তমানে হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। পাবনায় আগে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে কিছুটা কমেছে, তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন জেলা পরিদর্শন করছেন।
তিনি আরও জানান, সব হাসপাতালকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, হামের রোগী শনাক্ত হলে দ্রুত রিপোর্ট করতে হবে এবং আলাদা রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
মনোয়ারুল হক/
