ডিজেলে লোকসান দৈনিক ১০৯ কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, এবিসিনিউজবিডি, ঢাকা (২২ সেপ্টেম্বর): আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। শুধু ডিজেল বিক্রি করতেই বর্তমান বাজারদরে সরকার প্রতি লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা করে ভর্তুকি বা লোকসান দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনকালে তিনি এ তথ্য জানান। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে জানাতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল।
ব্রিফিংয়ে জাহেদ উর রহমান আরও পরিষ্কার করেন যে, প্রতিদিন কেবল ডিজেল খাতের পেছনেই সরকারকে প্রায় ১০৯ কোটি টাকার বেশি লোকসান বইতে হচ্ছে। এই হিসাব অনুযায়ী, শুধু ডিজেল থেকেই এক বছরে সরকারের সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ গিয়ে ঠেকতে পারে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায়।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পটভূমি তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরও চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান সহ্য করে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। তবে এই ধারাবাহিক আর্থিক ক্ষতি কমানো, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখা এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে জ্বালানি তেল পাচার হয়ে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি এড়াতেই সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম নতুন করে সমন্বয় করেছে।
নতুন এই মূল্যতালিকা অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ সময় এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি তেলের দামের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে ভারতের কলকাতায় প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৪.৭৬ টাকায়, মিয়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকায়, নেপালে ১৬১.২৪ টাকায়, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯.৪২ টাকায়, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকায় এবং পাকিস্তানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৮৫.৪৮ টাকায়।
তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সর্বনিম্ন থাকায় প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেল সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাওয়ার মারাত্মক আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব জ্বালানি তেলে লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে দাম সমন্বয় করায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) বার্ষিক লোকসান অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে দেশীয়ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরেন জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে অন্তত ১৫০টি নতুন কূপ খননের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস-২৮ নম্বর নতুন কূপের উদ্বোধন করা হয়, যেখান থেকে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক অতিরিক্ত ১২.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে গ্যাসের সরবরাহ আরও জোরদার হবে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিজিএফসিএলের অধীন বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. মো. আলম মোস্তফা এই সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।
মনোয়ারুল হক/
