মায়ের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার, অভিযুক্ত ছেলে যুগ্ম সচিবকে তাৎক্ষণিক বদলি
নিজস্ব প্রতিবেদক (ঢাকা), এবিসিনিউজবিডি, (৩ জুন) : রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলে ও যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। মায়ের প্রতি চরম অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায়ে তাকে তাৎক্ষণিক বদলি (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছে।
তিনি মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন)’ পদে দায়িত্বরত ছিলেন। আজ বুধবার (৩ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়।
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, আনিসুর রহমানকে তার বর্তমান পদ থেকে অবিলম্বে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মিরপুরের একটি বাসা থেকে ওই যুগ্ম সচিবের ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মায়ের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মায়ের এমন করুণ পরিণতি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন তার বিরুদ্ধে এই দ্রুত পদক্ষেপ নিলো।
গত রোববার (৩১ মে) মিরপুর-১১ নম্বরে একটি বাসা থেকে নুরজাহান বেগম নামে ওই বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, মরদেহটি পচে গিয়ে পোকায় ধরেছিল। ঘটনাস্থলে
ওই ঘটনায় মায়ের প্রতি অবহেলার অভিযোগে আজ দুপুরে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।
নূর জাহান বেগম তাঁর মেয়ের সঙ্গে যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাতে দেখা যায়, নূর জাহান বেগমের ঘরসহ পুরো ফ্ল্যাটের অবস্থা অত্যন্ত নোংরা, অস্বাস্থ্যকর। মরদেহের ফুটেজেও নূর জাহান বেগমের ডান চোখে সাদা ফাঙ্গাসের মতো পড়ে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পল্লবী থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বলছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় তাতে পোকার অস্তিত্ব দেখেছেন।
মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে মিরপুরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের ভবনটির চতুর্থ তলায় গিয়ে গণমাধ্যমের কর্মীরা দীর্ঘ সময় কলবেল দিয়ে অপেক্ষা করলেও কেউ দরজা খোলেননি।
তবে ভবনটিতে থাকা এবং আশপাশের প্রতিবেশীরা বলছেন, ঘরের ভেতরে একজন প্রবীণ নারী যেভাবে মারা গেলেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এলাকাবাসী এমন মৃত্যুকে অমানবিক বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের পর ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালে এ আইনের বিধিমালাও করা হয়। আইনে বলা হয়, প্রত্যেক সন্তানকে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো পিতা-মাতার একাধিক সন্তান থাকলে সন্তানেরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন। পিতা ও মাতার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবেন।
আইন না মানলে অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন বা অর্থদণ্ড অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নুরজাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে একাকী জীবনযাপন করছিলেন। একই বাসায় পাশাপাশি কক্ষে বসবাস করলেও তার মেয়ে মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেশীরা জানান, নুরজাহান বেগমের দুই ছেলে আলাদা থাকতেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে তার কোনো নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। তার এক ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান বর্তমানে যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্য ছেলে এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তার মেয়ে একজন স্কুলশিক্ষক।
মনোয়ারুল হক/
